Friday, July 29, 2016

" পাপাচারী জমজম "

" পাপাচারী জমজম "
অনেকদিন আগের কথা। একদিন হযরত ঈসা সিরিয়ার পথে যেতে যেতে একটা মানুষের মাথার খুলি পড়ে রয়েছে দেখতে পেলেন। সেই খুলিটার সঙ্গে কথা বলবার জন্য তাঁর খেয়াল হলো। তিনি তখনই খোদার দরগায় আরজ করলেনঃ হে প্রভু আমাকে এই খুলির সঙ্গে কতা বলবার শক্তি দাও।
খোদা তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। হযরত ঈসা খুলিকে বললেনঃ হে অপরিচিত কঙ্কাল, তোমাকে যে কথা জিজ্ঞাসা করবো, তার ঠিক ঠিক উত্তর দাও।
বলবার সঙ্গে সঙ্গে ঈসা শুনতে পেলেন, পরিস্কার ভাষায় সেই খুলিটা ‘কলেমা শাহাদাত’ পাঠ করলো।
ঈসা জিজ্ঞাসা করলেনঃ তুমি পুরুষ না স্ত্রী?
খুলি উত্তর করলোঃ পুরুষ।
ঈসা বললেনঃ তোমার নাম কি?
খুলি উত্তর করলোঃ জমজম।
ঈসা আবার জিজ্ঞাসা করলেনঃ তুমি আগে কি ছিলে?
খুলি উত্তর করলোঃ আমি আগে বাদশাহ ছিলাম!
ঈসা বললেনঃ বটে। তোমার জীবনে কি কি কাজ করেছিলে?
খুলি উত্তর করলোঃ আমি আগে একজন বাদশাহ ছিলাম। ধন-দৌলত, লোক-লস্কর আমার এত বেশি ছিলো যে, দুনিয়ার বাদশাহরা তা দেখে অবাক হয়ে যেতো। তারা আমাকে খুব ভয় আর সম্মান করতো। আমি কিন্তু কারো ওপর কোন অত্যাচার করতাম না। গরীব-দুঃখীদের সাধ্যমতো দান করতান। সমস্ত দিন নিজের কাজে ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু ভুলেও কখনো খোদার নাম মুখে আনতাম না। এমনি করে অনেকদিন আমি বাদশাহী করেছিলাম। একদিন দরবারে বসে কাজ করছি, এমন সময় হঠাৎ আমার মাথা ব্যথা হলো। যন্ত্রণা ক্রমে বাড়তে লাগলো। কিন্তু যন্ত্রণা ক্রমে অহস্য হয়ে উঠলো। যেখানে যত বড় হেকিম ছিলো, চিকিৎসার জন্য তাদের সকলকে ডাকা হলো। কিন্তু কিচুতেই কিছু হলো না। যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলাম। মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়তে আরম্ভ করলাম। এমন সময় হঠাৎ একটা আওয়াজ আমার কাণে ঢুকলো। কেহ যেন চিৎকার করে বলছেঃ জমজমের প্রাণ বের করে দোজখে ফেলে দাও। সেই সঙ্গে সঙ্গে এক বিকট মূর্তি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। উঃ, কি ভীষণ তার চেহারা! দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। তারপর কি হলো আমার মনে নেই। যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো তখন দেখলাম প্রাণ নিয়ে যাবার জন্য আজরাইল একা আসেনি –তার সঙ্গে আরো অনেক ফেরেশতা এসেছে। তাদের কারো হাতে লোহার ডাণ্ডা, কারো হাতে শিক, কারো হাতে তলোয়ার। সমস্তই আগুনের পোড়ান জবাফুলের মতো রাঙ্গা। তারা সেই সমস্ত দিয়ে আমাকে সেঁকা ও খোঁচা দিতে লাগলো। আমি যন্ত্রনায় চিৎকার করে বলতে লাগলামঃ ওগো তোমরা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমায় মেরো না। আমায় ছেড়ে দাও। আমার ভাণ্ডারে যত ধন-দৌলত হীরা-জহরৎ আছে সব তোমাদের দেবো। এই কথা শুনে তাদের মধ্যে একজন লোহার মতো শক্ত হাতে আমার গালে একটা চাপর দিয়ে বললোঃ রে নাদান! খোদা কারো ধন-দৌলতের পরোয়া করে না।
যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে কাতরভাবে তাদের মিনতি করে বললামঃ ওগো তোমরা আমায় ছেড়ে দাও। তার বদলে আমার বংশের প্রত্যেক আমি খোদার নামে কোরবানী করবো। এই বলে তাদের দয়ার ভিখিরী হয়ে কাতর নয়নে তাদেরদিকে চেয়ে রইলাম। তারা দাঁত কড়মড় করে ধমকে দিয়ে বললোঃ রে বেয়াদব! খোদা কি ঘোষখোর?
আজরাইল তখন ফেরশতাদের বললেনঃ আর দেরী করো না, এখনই এর প্রাণ বের করে দোজখে ফেলে দাও।
তারপর তারা আমার প্রাণ বের করে নিয়ে গেলো।
তারপর কি হলো আর জানবার ক্ষমতা রইলো না। হঠাৎ মনে হলো যেন আমার জ্ঞান ফিরে এসেছে। চোখ খুললাম। আমি কোথায় আছি প্রথমে বুঝতেই পারলাম না। অন্ধকার, চারিদিকে ঘন অন্ধকার –আলো নেই, বাতাস নেই। এই অবস্থা আমার অসহ্য হয়ে উঠলো, ক্রমে বুঝতে পারলাম যে আমাকে কবর দেওয়া হয়েছে আর সেই কবরের মধ্যে যেন হাজার ফেরেশতা এক সঙ্গে চিৎকার করে বলছেঃ রে নাদান! আমরা তোর প্রাণ বের করে নিয়ে গিয়েছিলাম পুনরায় তোর দেহের মধ্যে প্রাণ দিয়েছি। এখন এই কাফনের কাপড়ের উপর লেখ, দুনিয়ায় তুই কি কি কাজ করেছিস।
জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যা যা করেছি সব আমার মনে স্পষ্ট জাগতে লাগলো। আমি এক এক করে অল্প সময়ের মধ্যে লিখে ফেললাম।
তারপর ফেরেশতারা ভয়ানক গর্জন করে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ বল তোর খোদা কে?
আমি ভয়ে ভয়ে উত্তর করলামঃ তোমরাই আমার খোদা। আমি অন্য খোদা জানি না। তোমরা আমাকে রক্ষা করো।
এই কথা শুনে তারা ভয়ানক রেগে গেলো। লোহর ডাণ্ডা দিয়ে আমাকে বেদম প্রহার আরম্ভ করলো। তারপর মনে হতে লাগলো, কবরের মাটি চারিদিক থেকে যেন আমাকে পিষে ফেলবার চেষ্টা করছে। ক্রমে দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। মাটি চিৎকার করে বলতে লাগলোঃ রে বেঈমান! শত শত বৎসর আমার পিঠের উপরে বাদশাহী করে কত অত্যাচার করেছিস আর খোদার না-ফরমানী করেছিস তাই তোর এই শাস্তি। এই কথা বলে মাটি আমার হাড়গুলোকে গুঁড়ো করে ফেলবার চেষ্টা করতে লাগলো।
অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করেছি এমন সময়ে কতকগুলি ভীষণ-মূর্তিজীব আমাকে ধরে ওপরে নিয়ে গেলো। আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ভাবলাম, খোদা মেহেরবানি করে আমাকে মাফ করবেন। কিন্তু সে ভরসা শূন্যে মিলিয়ে গেলো যখন দেখলাম তারা আমাকে ধরে নিয়ে গেলো আর একজন লম্বা সাদা দাড়িওয়ালা বিকট চেহারার লোকের কাছে। সে লোকটা ভীষণ চিৎকার করেবলে উঠলোঃ এই কমবখতকে (হতভাগ্যকে) আগুনের শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলো, তারপর পায়ের দিক থেকে উল্টো করে ছিড়ে ফেলো।
তারা কখনই প্রভুর হুকুম তামিল করতে আরম্ভ করলো। এরপর তারা আমাকে পচা দুর্গন্ধময় একটি কূপের মধ্যে ফেলে দিলো।
ক্ষুধায়, পিপাসায় আর অসহ্য যন্ত্রণায় হৃদপিণ্ড যেন বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো। আমি কাতরভাবে তাদের বললামঃ দোহাই তোমাদের, আমাকে এক পাত্র পানি দাও।
ফেরেশতারা কিসের রস এনে আমাকে খেতে দিলো। চোখ বুঁজে সেই রস মুখের মধ্যে ঢেলে দিলাম। উঃ কি বিশ্রী দুর্গন্ধ? মনে হতে লাগলো এ জিনিস না খাওয়াই আমার পক্ষে ভাল ছিলো! চিৎকার করে বলতে লাগলামঃ কে আছ, আমায় এক পাত্র পানি দাও, পিপাসায় আমার প্রাণ যায়।
সেই কাতরোক্তি শুনে অপর একজন ফেরেশতা এক গ্লাস পানি নিয়ে এলো। মনে ভরসা হলো, এইবার বুঝি বেঁচে গেলাম। চোখ বুঁজে এক নিঃশ্বাস সবটুকু পান করলাম। উঃ এ যে আরো কটু ও দুর্গন্ধ! সমস্ত অন্তরটা জ্বলে যেতে লাগলো। নাক, মুখ, চোখ, কান এমন কি লোমের গোড়া দিয়ে পর্যন্ত দুর্গন্ধ বের হতে লাগলো। আমি চিৎকার করতে লাগলামঃ তোমরা এমন তিল তিন করে যাতনা দিয়ে আমাকে না মেরে যা করবার একেবারেই করে ফেলো। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
তারা কেউ আমার কথা গ্রাহ্য তো করলোই না বরং আমার সেই অবস্থা দেখে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে লাগলো। আমি যতই যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগলাম, ততই তারা হো-হো করে হাসতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে একজন ভীষণদর্শন ব্যক্তি আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। তার ভয়াবহ আকৃতি দেখে আমার বুক শুকিয়ে গেলো। সে তার বিষ-মাখানো লম্বা নখে আমাকে গেঁথে শূন্যে সোকরাৎ নামক এক পাহাড়ে নিয়ে গেলো। সেই পাহাড়ে সাতটা কূপ। প্রত্যেক কূপ থেকে বিষাক্ত গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। প্রত্যেক কূপে হাজার হাজার বিষাক্ত সাপ ও বিছা পরস্পর কামড়া-কামড়ি করছে আর তাদের মুখের বিষ-নিঃশ্বাসের এই ধুম নির্গত হচ্ছে। ফেরেশতারা আমার চুল ধরে সেই কূপের মধ্যে ফেলে দিলো। সাপ-বিছারা চারিদিক থেকে আমাকে কামড়াতে আরম্ভ করে দিলো। জ্বালায় চিৎকার করতে লাগলাম।
তারপর তারা আমাকে এক পুকুরের কাছে নিয়ে গেলো। সে পুকুরে পানি নেই, শুধু পুঁজ, রক্ত ও বিষে ভলা সেই পুকুর। আমার চুল ধরে সেই পুকুরের মধ্যে জোর করে তারা ডুবিয়ে রাখলো। যতই ওপরে উঠার চেষ্টা করি, ততই তারা জোর করে আমাকে চেপে ধরে রাখতে লাগলো। এই রকম করে এক কূপ থেকে আর এক কূপে এবং এক পুকুর থেকেআর এক পুকুরে হাজার বার ডুবিয়ে হাজার বার তুলে একশত বছর ধরে আমাকে কষ্ট দিলো।
তারপর আজ হঠাৎ শুনতে পেলাম কে যেন কাকে বলছে, যে পথে হযরত ঈসা যাচ্ছেন সেই পথে জমজমকে দোজখ থেকে তুলে ফেলে দাও। দুনিয়াতে সে অনেক ভাল কাজও করেছিলো। অন্নহীনকে অন্ন এবং বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান করেছিলো! সে আজ তার পুরস্কার পাবে। সে খোদার নাম একবারও মুখে আনেনি বলে যে পাপ করেছিলো তার শাস্তি পুরোমাত্রায় ভোগ করবার পর আবার দুনিয়াতে যাবে।
ঈসা জিজ্ঞাসা করলেনঃ জমজম তুমি আমার কাছে কি চাও?
জমজম বললোঃ তুমি খোদার কাছে এই প্রার্থনা করো, তিনি যেন আমার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে আমাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন।
ঈসা দুই হাত তুলে জমজমের জন্য খোদার কাছে আরজ করলেন। তারপর বললেনঃ জমজমের হাড় মাংস সমস্ত একত্র হয়ে পুনর্জীবন লাভ করুক।
বলতে না বলতে একটি সুদর্শন যুবক মাটি থেকে দাঁড়িয়ে হযরত ঈসাকে সালাম করলো।

" শাদ্দাদের বেহেশত "

" শাদ্দাদের বেহেশত "
অনেক আগের কথা। আরব দেশে সাদ নামে একটি বংশ ছিলো। এই বংশের লোকদের চেহারা ছিলো যেমন খুব লম্বা এবং চওড়া, গায়েও তেমনি ভীষণ শক্তি।
তারাই ছিলো তখন আরব দেশে প্রবল এবং প্রধান।
তাদের একজন বাদশাহ ছিলো –তার নাম শাদ্দাদ। শাদ্দাদ ছিলো সাত মুলুকের বাদশাহ। তার ধন-দৌলতর সীমা ছিলো না। হাজার হাজার সিন্দুকে ভরা মণি, মুক্তা, হীরা জহরৎ। পিলপানায় লক্ষ লক্ষ হাতী, আস্তাবলে অসংখ্য ঘোড়া। সিপাই-শাস্ত্রী যে কত তার লেখাজোকা ছিলো না। উজীর-নাজীর, পাত্র-মিত্র, আমলা-গোমস্তায় তার রঙমহল দিনরাত গম-গম করতো।
সাধারণতঃ মানুষের ধনদৌলত যদি একটু বেশি থেকে থাকে তবে সে একটু অহঙ্কারী হয়ই। শাদ্দাদ বাদশাহের দেমাগ এত বেশী হয়েছিলযে, একদিন সে দরবারে বসে উজীর-নাজীরদের ডেকে সিংহের মতো হুঙ্কার দিয়ে বললোঃ দেখ, আমার যে রকম শক্তি সামর্থ্য আর খুবসুরৎ চেহারা, তাতে আমি কি খোদা হবার উপযুক্ত নই?
উজীর-নাজীরেরা তাকে তোষামোদ করে বললোঃ নিশ্চয়ই।এত যার ধন-দৌলত, লোক-লস্কর, উজীর-নাজীর, দালান-কোঠা, হাতী-ঘোড়া তিনি যদি খোদা না হন, তবে আর খোদা হবার উপযুক্ত এ দুনিয়ায় কে? এত সিন্দুক ভরা মণিমুক্তা, হীরা-জহরৎ এত হাতী-ঘোড়া আর দরবার ভরা আমাদের মতো উজীর-নাজীর খোদা তার চৌদ্দপুরুষেও দেখেনি। সুতরাং আপনিই আমাদের খোদা।
আরব দেশের লোকেরা সে সময়ে গাছ, পাথর প্রভৃতি পূজা করতো। শাদ্দাদ এটা মোটেই পছন্দ করতো না। সে হুকুম জারি করলোঃ কেউ ইটপাথর বা অন্য মূর্তি পূজা করতে পারবে না, তার বদলে সম্রাট শাদ্দাদকে সকলের পূজা করতে হবে।
সাত মুলুকের বাদশাহ শাদ্দাদ, তার হুকুমের ওপরে কথা বলে এমন সাধ্য কারো নেই। সুতরাং তার হুকুম মতো কাজ চলতে লাগলো।
একদিন গুদ নামক একজন পয়গম্বর তার দরবারে এসে হাজির হলেন। পয়গম্বরেরা খোদার খুব প্রিয়। তাঁরা নবাব বাদশাহদের ভয় করতে যাবেন কেন। হুদ পয়গম্বর তাকে বললেনঃ তুমি নাকি খোদার ওপর খোদকারী করার চেষ্টা করছো? তোমার এ দুঃসাহস কেন? পরকালের ভয় যদি থাকে তবে আল্লাহতা’লার উপর ঈমান আনো।
হুদ নবীর দুঃসাহস দেখে দরবারের সকলে অবাক! উজীর-নাজীর, পাত্র-মিত্র যার ভয়ে সর্বদা সন্ত্রস্ত-স্বয়ং বেগম সাহেবা যার কথার ওপরে কথা বলতে পারেন না, সামান্য একজন দরবেশ কিনা তাকে দিচ্ছে উপদেশ! এত বাচালতা! ক্রোধে শাদ্দাদের চোখ দুটো দাল হয়ে উঠলো। মেঘগর্জনের মতো হুঙ্কার দিয়ে সে জিজ্ঞাসা করলোঃ মূর্খ ফকির, তোমার খোদাকে মানতে যাবো কিসের জন্য?
হুদ নবী বললেনঃ তিনি পরম মঙ্গলময়। তিনি দুনিয়াতে তোমাকে সুখে রাখবেন এবং মৃত্যুর পর তোমাকে বেহেশতে থাকতে দিবেন।
শাদ্দারেদ ওষ্ঠে এইবার ক্রোধের পরিবর্তে হাসি ফুটে উঠলো। বললোঃ তোমার খোদা কি আমার থেকেও বেশী সুখী।
হুদ হেসে জবাব দিলেনঃ নিশ্চয়ই! খোদাতা’লা নেকবান্দার জন্য বেহেশত তৈরি করেছেন। দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলে পরকালে বেহেশত। বেহেশতের অতুলনীয় শোভা, অনন্ত শান্তি, অফুরন্ত সুখ, চাঁদের মতো খুবসুরৎ হুরী তো তুমি ভোগ করতে পারবে না।
শাদ্দাদ অবজ্ঞা ভরে হো-হো করে হেসে উঠলো। বললোঃ রেখে দাও তোমার খোদার বেহেশতের কাহিনী। অমন আজগুবি গল্প ঢের ঢের শুনেছি।
হুদ বললেনঃ আজগুবি নয় –সত্যি সত্যিই। খোদার এমন অপরূপ বেহেশত কি তোমার পছন্দ হয় না?
শাদ্দাদ জবাব দিলোঃ হবে না কেন –এমন আজব বেহেশত কার অপছন্দ বলো? কিন্তু তাই বলে তোমার খোদার পায়ে আমি মাথা ঠুকতে যাবো কেন? আমি কি খোদার মতো বেহেশত তৈরি করতে পারি না!
হুদ বললঃ বাদশাহ, তোমার মাথা খারাপ হয়েছে, নইলে এমন কথা বলতে না। খোদা যা করতে পারেন তা মানবের সাধ্যাতীত।
শাদ্দাদ সহাস্যে বললোঃ মূর্খেরা এমন কল্পনাই করে বটে! কিন্তু আমি নিশ্চয়ই পারবো। তোমার খোদার চেয়ে আমার টাকা পয়সা লোক-লস্কর কিছু অভাব আছে নাকি? আমি দেখিয়ে দেবো, তোমার খোদার বেহেশত থেকে আমার বেহেশত কত বেশি সুন্দর।
শাদ্দাদের কথা শুনে হুদ ভয়ানক রেগে গেলেন। বললেনঃ মূর্খ বাদশাহ এত স্পর্ধা তোমার! শীঘ্রই দেখতে পাবে –এত অহঙ্কার কিছুতেই খোদা সহ্য করবেন না।
শাদ্দাদ ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেনঃ কে আছ, এই ভিখারীটাকে ঘাড় ধরে বের করে দাও।
হুদ নবী অপমানিত হয়ে চলে গেলেন।
কিছুদিন পরের কথা।
বদখেয়ালী শাদ্দাদ তার তাঁবেদার বাদশাহদের ফরমান জারি করে জানালেনঃ খোদার বেহেশতের চেয়ে বেশী সুন্দর করে অপর একটি বেহেশত আমি সৃষ্টি করতে সঙ্কল্প করেছি। সুতরাং উপযুক্ত জায়গায় সন্ধান করো।
হুকুম মাত্র জায়গা তল্লাসের ধুম পড়ে গেলো। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আবার দেশের এয়মন স্থানটি সকলের পছন্দ হলো। স্থানটি লম্বায় আট হাজার মাইল আর চওড়ায় ছিলো পাঁচ হাজার মাইল।
বেহেশতের উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেছে শুনে শাদ্দাদ খুশী হলো। তারপর হুকুম জারি করলো যে সাত মুলুকে যে, সব হীরা, মণি, মুক্তা, জহরৎ আছে সব এক জায়দগায় জড়ো করতে হবে। বাদশাহের হুকুম কেউ অমান্য করতে সাহস করলো না।
দেখতে দেখতে দামী দামী হীরা, মণি, পান্না, জহরৎ এয়মন মুলুকে জমা হতে লাগলো।
দুনিয়ার যেখানে যত সুন্দর মূল্যবান জিনিস ছিলো বেহশত সর্বাঙ্গ সুন্দর ইয়াকুত ও মার্বেল যোগার করা হলো। লক্ষ লক্ষ মজুর ও কারিগর কাজ করতে আরম্ভ করলো। দিনরাত পরিশ্রম করে তিনশ’ বছর ধরে বেহেশত রচনা করা হলো। তা সত্য সত্যই বিচিত্র কারুকার্যময় ও অপূর্ব চমকপ্রদ হয়েছিল।
এই বেহেশতের যে দিকে নজর দেওয়অ যায় সেই দিকেই অপরূপ। চারিদিকে শ্বেত পাথরের দেওয়াল ও থাম, তাতে কুশলী শিল্পীদের চমৎকার কারুকার্য-দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। দেয়ালের গায়ে নানা রঙের ইয়াকুত পাথর দিয়ে এমন সুন্দর লতাপাতা ও ফুল তৈরি করা হয়েছে যে, ভ্রমর ও মৌমাছির জীবন্ত মনে করে তার ওপরে এসে বসে। রঙমহলের চারিপাশে হাজার হাজার ঝড় লণ্ঠন ঝুলছ, কিন্তু বাতির দরকার হয় না। অন্ধকার রাত্রেও সেই ঘরগুলো চাঁদের আলোর মতো স্নিগ্ধ ও উজ্জ্বল।
মহরে ধারেই বসবাস ঘর ও হাওয়াখানা। মণিমুক্তা-খচিত শ্বেত ও কৃষ্ণবর্ণ পাথরের কৌচ ও মেঝে সজ্জিত রয়েছে। মেঝের ওপরে নানারঙের নানা আকারের সুন্দর সুন্দর ফুলদানী, তাতে সাজানো রয়েছে জমরদ ও ইয়াকুত পাথরের নানা রকমের ফুলের তোড়া। তা থেকে আতর গোলাপ মেশক ও জাফরাতের খোশবু ছুটছে।
মহলের চারিপাশে বাগান। বাগানে সোনা রূপার গাছ। তার পাতা, ফল, ফুল, নানা বর্ণের পাথর দিয়ে তৈরি। ভ্রমর ও মৌমাছিগুলো এমন সুন্দরভাবে নির্মিত যে তারা বুঝি সত্য সত্যই ফুলের ওপরে বসে মধু পান করছে। সেই সব ফুলফল থেকে যে সৌরভ বের হচ্ছে তাতে চারিদিকের বাতাস ভর ভর করছে।
এই সব গাছের নিচে দিয়ে কুল কুল শব্দে বয়ে চলেছে গোলাপপানির নহর। তার পানি এত স্বচ্ছ যে, মনে হয় তরর মুক্তার ধারা বয়ে যাচ্ছে। সেই নহরের ধারে ধারে হীরা-মণি-মুক্তার বাঁধানো ঘাট। সেখানে চুনি-পান্নার তৈরি শত শত সুন্দরীরর যেন গোসল করছে।
তার পরেই নাচঘর। কোনো ঘরে ওস্তাদেরা হাত নেড়ে মাথা দুলিয়ে নানা অঙ্গতরী করে গান করছে, বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে –কোনো ঘরে কিন্নকণ্ঠি সুন্দরী বালিকারা তালে তালে নাচছে এবং গান গাইছি। এরাই শাদ্দাদের বেহেশতের হুরী। নানা দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করে এদের এখানে জমায়েত করা হয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে নাচছে চাঁদের মতো খুবসুরৎ হাজার হাজার কচি কচি বালক।
অনিন্দ্য সুন্দর করে বেহেশত নির্মাণ করা হয়ে গেলো। শাদ্দাদকে সংবাদ দেওয়া হলো। সে তখন অধীন নবাব বাদশাহদিগকে হুকুমজারি করে জানিয়ে দিলো, তারা যেন শীগগিরই শাদ্দাদের সহিত মিলিত হয়। তাদের সঙ্গে নিয়ে সে তার বেহেশত দেখতে যাবে। প্রজাগণকে আমোদ আহলাদ করবার হুকুম দেওয়া হলো। বাদশাহের হুকুম মেনে তারা নাচ করতে লাগলো এবং হরদম বাজি পোড়াতে লাগলো।
এক শুবদিনে সুন্দর সুসজ্জিত ঘোড়ায় চড়ে পাত্র-মিত্র, উজীর-নাজীর, লোক-লস্কর, সৈন্য-সামন্ত সঙ্গে নিয়ে ঢাক, ঢোল, কাড়া, নাকাড়া, দামামা বাজাতে বাজাতে হাজারবাদশাহ তার সৃষ্ট বেহেশত দেখতে চললো।
গল্পগুজব করতে তারা এগিয়ে চললো। দূর থেকে নজর পড়লো বেহেশতের একটা অংশ। এত চমকপ্রদ, এত জমকালো যে, চোখ ঝলসে যেতে লাগলো। আনন্দে শাদ্দাদের মুখ দিয়ে কথা সরলো না। তাপর একটু সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে বলতে লাগলোঃ ঐ আমার বেহেশত! ঐ বেহেশতের সিংহাসনে আমি খোদা হয়ে সববো, আর তোমরা হবে আমার ফেরেশতা। হুরীর যখন হাত পা নেড়ে নাচবে আর গাইবে তখন কি মজাই না হবে।
উজীর-নাজীর ওমরাহগণ তার কথায় সায় দিয়ে তোষামোদ করে তাকে কুশী করতে লাগলো। এমনি করতে করতে তারা বেহেশতের দরজায় এসে হাজির হলো। শাদ্দাদ সকলের আগে আগে যাচ্ছিল! সে বেহেশতের দ্বারদেশে একটি রূপবান যুবক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো। তার সুন্দর চেহারা দেখে খুশী হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলোঃ তুমি কি এই বেহেশতের দারোয়ান?
যু্বক উত্তর করলোঃ আমি মালাকুল মওৎ!
শাদ্দাদ চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করলোঃ তাঁর মানে?
যুবক উত্তর করলোঃ আমি আজরাইল। তোমার প্রাণ বের করে নিয়ে যাবার জন্য খোদা আমাকে পাঠিয়েছেন।
শাদ্দাদ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠলো। চিৎকার করে বললোঃ সাবধান! আমার সঙ্গে তামাসা! কে আছিস বলে অন্যের প্রতীক্ষা না করে নিজেই খাপ থেকে তরবারী বের করে যুবককে কাটতে অগ্রসর হলো।
কিন্তু কি আশ্চর্য! তার হাত উঁচু হয়েই রইলো। উত্তেজনায় শরীর দিয়ে দরদর ধারায় ঘাম নির্গত হতে লাগলো। চিৎকার করে বললোঃ সৈন্যগণ, শয়তানকে মাটিতে পুঁতে ফেলো।
যুবক অট্টহাসি হেসে প্রশ্ন করলোঃ কই তোমার সৈন্য সামন্ত?
শাদ্দাদ পিছন ফিরে দেখতে পেলো, তার লোক-লস্কর, সৈন্য-সামন্ত একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভয়ে সে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলো। তারপর ভীত কণ্ঠে বললোঃ সত্যই তুমি কি আজরাইল?
আজরাইল বললোঃ হ্যাঁ। দেরী করবার ফুরসৎ আমার নেই। আমি এখনই তোমার প্রাণ বের করে নেবো।
শাদ্দাদ চারিদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলো। সে শিশুর মতো নিঃসহায়ভাবে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলো। মিনতি করে বললোঃ একটু সময় আমাকে দাও ভাই আজরাইল। অনেক সাধ করে আমি বেহেশত তৈরি করেছি, একটিবার আমায় তা দেখতে দাও! এই বলে সে ঘোড়া থেকে নামবার চেষ্টা করলো।
মেঘের মতো গর্জন করে আজরাইল বললোঃ খবরদার, এক পা এগিয়ে আসবে না। শাদ্দাদ হাউ-মাউ করতে শুরু করে দিলো। সেই অবস্থাতেই আজরাইলতার প্রাণ বের করে নিয়ে চলে গেলো।
তারপর কি হলো?
হঠাৎ একটা ভীষণ আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে শাদ্দাদের অতি সাধের বেহেশত, তার শ্রী, ঐশ্বর্য, লোক-লস্কর, উজীর-নাজীর, পাত্র-মিত্র সবকিছু চক্ষের পলকে মাটির মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেলো। দুনিয়ার ওপরে তার আর কোন চিহ্নই রইলো না। শুধু মানুষের মনে চিরদিনের মতো আঁকা হয়ে রইলো আত্মম্ভরিতা অহঙ্কারের শাস্তি কিরূপ ভয়ঙ্কর।

" ইউসুফ ও জুলেখা "

" ইউসুফ ও জুলেখা "
বৃদ্ধ বয়সে বিবি সারা খাতুনের গর্ভে হযতর ইব্রাহিমের এক পুত্র সন্তান জন্মে। তাঁহার নাম ইসরাইল (আঃ)। ইসরাঈলের দুই পুত্র ইয়াশা ও ইয়াকুব। ইয়াকুবের বারোটি পুত্র, তন্মধ্যে একাদশ পুত্র হযরত ইউসুফ। কনিষ্ঠ পুত্রের নাম বনি-ইয়ামিন।
হযরত ইয়াকুব জানতেন যে, ইউসুফ ভবিষ্যৎ জীবনে নবী হবেন। তিনি অতি গুণবান, শ্রী ও লাবণ্যমণ্ডিত ছিলেন। শৈশবেই ইউসুফ ও বনি ইয়ামিন মাতৃহীন হন। নানা কারণে হযরত ইয়াকুব অন্যান্য সন্তান অপেক্ষা ইউসুফকে একটু বেশী আদর যত্ন করতেন। এই জন্য বিমাতার গর্ভে অপর দশজন ভ্রাতা ইউসুফকে একটু ঈর্ষার চক্ষে দেখতেন।
ইউসুফ একদা রাত্রে স্বপ্ন দেখতে পেলেন –সূর্য চন্দ্র ও এগারটি নক্ষত্র তাঁকে যেন অভিবাদন করছে। পরদিন পিতার নিকটে কথাটা বললেন। ইয়াকুব স্বপ্ন-বৃত্তান্ত শুনে খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললেনঃ তোমার পিতামাতা ও এগারটি ভাইয়ের চাইতে তুমি শ্রেষ্ঠ হবে। কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি তোমর অপর ভ্রাতাদের নিকটে এ বিষয়ে কিছু বলো না। কারণ তা হলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে পারে।
পিতার মনে আশঙ্কা ছিলো একে তো ভাইরা ইউসুফকে হিংসার চোখে দেখে তার ওপরে তারা কোনো গতিকে স্বপ্নের কথা জানতে পেরে হয়তো আরো হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু সাবধানতা সত্ত্বেও ভ্রাতারা স্বপ্ন বৃত্তান্ত জানতে পারলো। তারা পরামর্শ করতে লাগলো, কিরূপে ইউসুফকে তাদের মধ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। অনেক যুক্তিতর্কের পর তারা স্থির করলো তাঁকে না মেরে কূপের মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে। যদি ভাগ্যে থাকে কোন পথিকের দয়ায় তাঁর প্রাণরক্ষা হলেও হতে পারে।
এইরূপ পরামর্শ করে তারা পিতার নিকটে গিয়ে বললেনঃ আব্বা, ইউসুফ তো এখন বড়োসড়ো হয়েছে, ওকে আর বাড়িতে রাতদিন না রেখে আমাদের সঙ্গে মাঠে পাঠিয়ে দিন। সেখানে সে খেলাধূলা করবে। আমরা তাকে দেখাশুনা করবো।
হযরত ইয়াকুব প্রথমে তাদের কথায় রাজি হলেন না। কিন্তু তাদের পীড়াপীড়ি ও অনেক তর্কের পর অবশেষে তাদের সঙ্গে যেতে অনুমতি দিলেন।
পরের দিন তারা ইউসুফকে অনেক দূরে এক নির্জন মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে তার দেহ থেকে জামা কাপড় খুলে নিয়ে তাকে নির্দয়ভাবে প্রহার করলো। ইউসুফ প্রায় মরে যাবার মতো হলেন। তাদের সবচেয়ে বড় ভাই বললোঃ তোমরা ওকে মেরে ফেলো না। ওকে কূয়ার মধ্যে ফেলে দাও।
তখন নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে তারা কূপের মধ্যে ফেলে দিয়ে বাড়ি চলে গেলো।
বাড়ি এসে পিতার নিকটে তারা কপট দুঃখ প্রকাশ করতে করতে জানালোঃ আব্বা ইউসুফকে বাঘে খেয়েছে। এই দেখুন তার জামায় রক্ত।
হযরত ইয়াকুব আর কি করেন। তিনি শোকে মুহ্যমান হয়ে কাঁদতে লাগলেন। কয়েকদিন পরে একদল সওদাগর সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মরুভূমির পথে সঙ্গে পানীয় প্রায় নিঃশেষ হওয়ার কূপ থেকে পানি সংগ্রহের ইচ্ছা করে তাঁরা বালতি নামিয়ে দিলেন। সেই সময়ে খোদার আদেশে ইউসুফ তাঁদের বালতির মধ্যে উঠে এলেন। ওদিকে তাঁর দশ ভাই তখন সেখানে ভেড়া চরাচ্ছিল। তারা ইউসুফকে দেখতে পেয়ে ছুটে এসে বললোঃ কি আশ্চর্য, এ যে আমাদের সেই গোলাম –কয়েক দিন থেকে পালিয়ে এসেছে। একে যদি আপনারা ক্রয় করেন তবে আমরা বিক্রি করতে পারি।
প্রতিবাদ করলে ভ্রাতারা পাছে তাঁকে বধ করে এই ভয়ে ইউসুফ চুপ করে রইলেন। কয়েকটি টাকা দিয়ে সওদাগরেরা তাঁকে কিনে নিলেন। সওদাগরের সঙ্গে ইউসুফ মিশর দেশে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে তাঁকে কিনে নিলেন। সওদাগরের সঙ্গে ইউসুফ মিশর দেশে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে তাঁকে তাঁরা বাদশাহের এক আত্মীয় কিৎফীর আজিজ নামক একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নিকটে বিক্রয় করলেন। আজিজ ইউসুফকে তাঁর স্ত্রী জুলেখার খাস গোলাম করে দিলেন।
ইউসুফ বয়ঃপ্রাপ্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে অসামান্য রূপবান হয়ে উঠতে লাগলেন। তাঁর অপরূপ শ্রী, লাবণ্য ও সুগঠিত দেহ সৌষ্ঠবের প্রতি প্রভু-পত্নী জুলেখা দিন দিন আকৃষ্ট হতে লাগলেন। একদিন তিনি তাঁর প্রতি আনুগত্য হবার জন্য অনুরোধ জানালেন। কিন্তু ইউসুফ সে কথায় একেবারে কর্ণপাত মাত্র করলেন না। জুরেখা নানা প্রকার প্রলোভন দিয়েও তার মন জয় করতে পারলেন না। অবশেষে নিরাশ হয়ে তিনি তাঁর স্বামীর নিকটে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন।
ইউসুফ দোষারোপের প্রতিবাদ করে বললেনঃ এই নারীই আমাকে অন্যায় কার্যে লিপ্ত করবার চেষ্টা করেছে।
এইরূপে একে অন্যের নামে দোষ দেবার চেষ্টা করতে লাগলেন। ইউসুফ ও জুলেখার এই সকল কাহিনী ক্রমে প্রকাশ হয়ে পড়লো। অন্যান্য রমণীরা ছি ছি করতে লাগলো। তারা জুলেখার দোষ দিতে লাগলো।
জুলেখা যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর সম্বন্ধে অপরাপর মহিলারা অন্যায় আলোচনা আরম্ভ করেছে, তখন তিনি তাদের জব্দ করার জন্য ফন্দী আঁটলেন। তিনি একদিন তাদের নিমন্ত্রণ করলেন এবং ছুরি দিয়ে কেটে খেতে হয় এমন একটি খাবার প্রস্তুত করলেন। সকলে খেতে এলে তাদের প্রত্যেককে এক একটি ছুরি দিলেন। তারা যখন খেতে আরসম্ভ করেছে ঠিক সেই সমেয় জুলেখা ইউসুফকে ডাকলেন। ইউসুফকে দেখে মেয়রা এত বিস্মিত ও মুগ্ধ হলো যে তারা খাবার কাটতে গিয়ে নিজেদের আঙ্গুল কেটে ফেললো। তারা বলাবলি করতে লাগলোঃ এত রূপ! এত সুন্দর! এ কি মানুষ না ফেরেশতা।
জুলেখা সেই সময়ে সুযোগ পেয়ে বললেনঃ তোমরা আমাকে দোষী করছিলে –এবার তো তোমরাও দোষী।
নিমন্ত্রিত মহিলারা এবাসের সত্য সত্যই লজ্জিত হলো।
ইউসুফের প্রতি নারীদের এইরূপ আসক্তির কথা জানতে পেরে সমাজের মাতব্বরেরা শঙ্কিত হলেন। তাঁরা নৈতিক জীবন পবিত্র রাখার জন্য ইউসুফের বিরুদ্ধে বাদশাহের নিকট অভিযোগ করলেন। বাদশাহ উপায়ান্তর না পেয়ে নিরপরাধ ইউসুফের কারাবাসের হুকুম দিলেন।
ইউসুফক কয়েদখানায় নেওয়া হলো। তাঁর সঙ্গে আরো দু’টি যুবককে কারাগারে প্রেরণ করা হলো।
একদা রাত্রে সেই যুবক দু’টি স্বপ্ন দেখলো। সেই স্বপ্নের কথা ইউসুফকে জানালো। একজন বললো, সে যেন আঙ্গুর থেকে রস বের করছে।
অপর একজন বললো, সে যেন মাথায় বয়ে রুটি নিয়ে যাচ্ছে! কতকগুলি পাখি সেই রুটিগুলো ঠুকরে খাচ্ছে।
ইউসুফ খোদাতা’লার কৃপায় প্রগাঢ় তত্ত্বদর্শী হয়েছিলেন। তিনি স্বপ্ন-বৃত্তান্ত শ্রবণ করে বললেনঃ দেখ, তোমাদরে একজন শীঘ্রই মুক্তি পাবে এবং বাদশাহের সঙ্গী নিযুক্ত হয়ে তাঁকে শরবত পান করাবে। অপরজনের ফাঁসী হবে এবং তার মাথা পাখিতে ঠুকরে খাবে।
কয়েকদিনের মধ্যেই ইউসুফের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য সত্যই ফলে গেলো। একজন মুক্তি পেলো অপর জনের ফাঁসী হলো। যে ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছিলো সে বাদশাহের অনুচর নিযুক্ত হলো।
কিছুদিন পরে বাদশাহ এক স্বপ্ন দেখলেন, সাতটি কৃশকায় গাভী সাতটি বলবতী গাভীকে খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি শীর্ণ ধানের শীষ সাতটি সতেজ ধানের শীষকে খেয়ে ফেলছে। বাদশাহ পরদিন দরবারে স্বপ্ন বৃত্তান্ত প্রকাশ করে অনুচরদের কাছে এর অর্থ জানতে চাইলেন। কিন্তু কেউ সদুত্তর দিতে পারলো না। কারাগারের সেই যুবক সেখানে উপস্থিত ছিলো। ইউসুফের কথা তার মনে পড়ে গেলো তখনই তাঁর কাছে গিয়ে সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলো। ইউসুফ বললেনঃ প্রথমে সাত বৎসর খুব ভীষণ অজন্মা ও দুর্ভিক্ষ হবে সে সময় তোমরা সেই সঞ্চিত শস্য থেকে খরচ করতে পারবে।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে পেয়ে বাদশাহ খুব সন্তুষ্ট এবং ইউসুফকে তাঁর নিকটে আনবার সঙ্কল্প করলেন।
যে সকল মেয়ে অসাবধানতায় নিজেদের আঙ্গুল কেটে ফেলেছিলো, তাদের কাছে অনুসন্ধান করে বাদশাহ জানতে পারলেন ইউসুফ তাদের সংগে কোনো অসদ্ব্যবহার করেননি। তারাই ইউসুফকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলো। জুলেখাও সেখানে ছিলেন। তিনি এ কথার সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিলেন। বাদশাহ সব কথ শুনে অনুতপ্ত হলেন এবং ইউসুফকে মুক্তি দিয়ে তাঁকে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করলেন।
ইউসুফের স্বপ্নের ব্যাখ্যা সত্য সত্যই সফল হলো। প্রথম সাত বৎসর ভাল ফসল হলো এবং পরের সাত বৎসর ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো।
মিশরের সঞ্চিত খাদ্যের কথা জানতে পেরে নানা দেশ থেকে লোকজন আসতে লাগলো। ইউসুফের ভ্রাতারাও খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতে এলো। তিনি তাদের দেখে চিনতে পারলেন, কিন্তু তারা তাঁকে চিনতে পারলো না। তিনি ভ্রাতাদের খাদ্য দিয়ে বলে দিলেনঃ আবার যখনআসবে তোমাদের ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এসো। তাকে না নিয়ে এলে খাদ্য পাবে না। এই বলে অনুচরবর্গের দ্বারা কিছু অর্থ গোপনে খাদ্যের থলির মধ্যে পুরে দিলেন।
তারা বাড়ি গিয়ে তাদের পিতাকে মিশরের শাসনকর্তার অনেক গুণের কথা বর্ণনা করলো এবং এবারে ছোট ভাইকে নিয়ে যাবার জন্য বলে দিয়েছেন সে কথাও জানালো। হযরত ইয়াকুব তাদের পূর্বের কাজ স্মরণ করে কনিষ্ঠ পুত্র বনি ইয়ামিনকে তাদের সঙ্গে দিতে রাজি হলেন না।
খাদ্যের বস্তা খোলা হবার পর তার মধ্যে টাকা দেখতে পেয়ে তারা খুবই বিস্মিত হলো।
পুনরায় খাদ্যাভাব ঘটলে তারা তাদের পিতাকে গিয়ে শক্ত করে ধরে বললোঃ আব্বা, আপনি ছোট ভাইকে আমাদের সংগে যেতে দিন। খোদার নামে শপথ করে বলছি, আমরা তাকে অক্ষত দেহে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো।
পিতা তাদের জিদের কাছে পরাজিত হয়ে অগত্যা অনুমতি দিলেন। বনি-ইয়ামিনকে সংগে নিয়ে তারা গেলো এবং ইউসুফের নির্দেশ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করলো। ইউসুফের কাছে যখন তারা পৌঁছলো তখন ছোট ভাইকে ডেকে নিয়ে তিনি নিজের পরিচয় প্রদান করলেন।
অন্যবারের মতন এবারেও তাদের বস্তা বোঝাই করে খাদ্য দেওয়া হলো। ইউসুফের এক চাকর একটি পেয়ালা ইচ্ছা করে ছোট ভাইয়ের বস্তায় লুকিয়ে রেখে দিলো।
পেয়ালা হারিয়ে যাওয়ায় বিশেষ সোরগোল পড়ে গেলো। অবশেষে অনেক খোঁজা-খুঁজির পর বনি-ইয়ামিনের বস্তার মধ্যে সেটা পাওয়া গেলো।
বনি-ইয়ামিনকে বাদশাহের কাছে বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। তার ভ্রাতারা বললেনঃ আমাদের পিতা খুব বৃদ্ধ হয়েছেন। এটি তার সকলের ছোট ছেলে। একে ফিরিয়ে না নিয়ে গেলে পিতা বড়ই কষ্ট পাবেন। আপনি এর বদলে আমাদের একজনকে রাখুন!
ইউসুফ বললেনঃ তা হতে পারে না।
সকলের বড় ভাই অন্যান্য সকলকে বললোঃ তোমরা ফিরে যাও, আমি আল্লাহর নাম শপথ করে পিতাকে বলে একে নিয়ে এসেছি। কোন মুখে পিতার কাছে ফিরে যাবো। আমি বনি-ইয়ামিনের সঙ্গে এখানেই থাকবো‍!
তারা দেশে গিয়ে হযরত ইয়াকুবকে সমস্ত সংবাদ জানালো। তিনি শুনে দুঃসহ শোকে আর্তনাদ করতে লাগলেন। শোক কিঞ্চিৎ প্রশতিম হলে বললেনঃ দেখ আল্লাহর দয়ায় আমি অনেক কিছু জানি। তোমরা আল্লাহর ওপরে বিশ্বাস রেখে ইউসুফ ও বনি ইয়ামিনের খোঁজ করো।
পিতার আদেশে তারা পুনরায় মিশরে গেলো এবং খাদ্য কিনতে চাইলো। সেই সময় ইউসুফ তাদের কাছে নিজের পরিচয় প্রদান করলেন। বললেনঃ আল্লাহতা’লা তোমাদের ক্ষমা করবেন, তিনি ক্ষমাশীল। তোমরা আমার এই জামা পিতার কাছে নিয়ে যাও, তাহলে তিনি জানতে পারবেন।
আল্লাহর কৃপায় ইয়াকুব সব জানতে পারলেন। ইউসুফের ভাইরা এসে তার জামা পিতাকে দিলেন। হযরত ইয়াকুব খুশী হয়ে বললেনঃ পূর্বেই বলেছি, আমি যা জানি তোমরা তা জান না।
ইউসুফের পরামর্শ মতো তাঁর ভ্রাতারা তাদের পিতামাতা ও অন্যান্য পরিজনদের নিয়ে মিশরে গেলেন। সেখানে ইউসুফ তাঁদের বসবাস করবার ব্যবস্থা করে দিলেন।

ফেরাউন ও মুসা

ফেরাউন ও মুসা
মহাপ্লাবনের পর বহুকাল অতিবাহিত হয়েছে। নূহের বংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বংশে একজন পরম ধার্মিক লোক জন্মগ্রহণ করলেন, তাঁর নাম ইসরাইল। তিনি যে দেশে বাস করতেন তার নাম কেনান। মিশরের বাদশাহ ফেরাউন তাঁকে মিশরে এসে বাস করার আমন্ত্রণ করেন। তিনি ইসরাইলকে যথেষ্ট প্রীতির চক্ষে দেখতেন। ফেরাউন কালক্রমে পরলোক গমন করলে অপর একজন ফেরাউন সিংহাসনে উপবেশন করলেন। ফেরাউন কোন লোকের নাম নয়। মিশরের বাদশাহদিগকে ফেরাউন বলা হতো, ইহা পদবী যাহা হউক, পরের এই ফেরাউন অত্যাচারী ছিলেন। তিনি পূর্ববর্তী ফেরাউনের একজন উজীর ছিলেন। প্রথমে তিনি খুব সৎস্বভাবের লোক ছিলেন। নানা রকমে প্রজাদের উপকার করতেন।
কোন বৎসর অজন্মা হলে তিনি নানা রকম কৌশল করে প্রজাদের খাজনা মওকুফ করবার বা শোধ করবার ব্যবস্থা করতেন। যদি রাজ্যে কখনও দুর্ভিক্ষ দেখা দিতো তাহলে তিনি বাদশাহের ধনাগার থেকে কৌশলে অর্থ বের করে গরীব প্রজাদিগকে অনাহারের কবল থেকে রক্ষা করতেন। এইজন্য প্রজারা তাঁকে খুব বেশি সম্মান ও ভক্তি করতো। ফেরাউন গত হলে মিশর দেশের লোকেরা তাঁকেই তাদের বাদশাহ নিযুক্ত করলেন।
কিন্তু বাদশাহ হবার পর তার মনের অবস্থা যেন আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেলো। তিনি ইসরাইল ও তার বংশধরগণের ওপরে অত্যাচার আরম্ভ করলেন। তিনি অনেক দেশ জয় করে তাঁর রাজ্য আরও বৃদ্ধি করলেন। চারদিক থেকে রাজস্ব ও উপঢৌকন এসে তার ধনাগার পূর্ণ হতে লাগলো। সাধারণ ব্যক্তি সহসা বিত্তশালী হলে তার মনে অহঙ্কার জন্মে এবং তার নানা কু-পরামর্শতাদাও জোটে। সুতরাং ফেরাউনেরও এমন হিতৈষী বন্ধুর অভাব ঘটল না। হামান নামক একজন কূটবুদ্ধি উজীর তাঁকে দুনিয়ার বাদশাহ হবার স্বপ্ন দেখাতে লাগলো। প্রজারা যাতে নীরেট মূর্খ হয়ে থাকে এবং তাকে খোদা বলে মান্য করে তার জন্য নানা যুক্তি-পরামর্শ দিতে লাগলো।
মন্ত্রী হামানের পরামর্শ মতো ফেরাউন সমগ্র রাজ্যের মাতব্বর প্রজাদের ডেকে একটা বড় সভা করলেন। সেই সভাতে তিনি তাদের বুঝিয়ে দিলেন যে, লেখাপড়া শিখে মিছামিছি সময় নষ্ট করবার আর প্রয়োজন নেই। কারণ, লোকের পরমায়ু অতি অল্পকাল। এই সঙ্কীর্ণ সময়ের মধ্যে জীবনের বেশির ভাগ দিনই যদি মক্তবে এবং পাঠশালায় গমনাগমন করে এবং পড়ার ভাবনা ভেবে ভেবে কাটিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আমোদ আহলাদ এবং স্ফুর্তি করবার অবসর পাওয়া যাবে না। সুতরাং সারাজীবন ভরে আমোদ করো –মজা করো। তাহলে মরবার সময়ে মনে বিন্দুমাত্র অনুতাপ আসবে না।
প্রজারা ফেরাউনের ও হামানের এই উপদেশ সানন্দে গ্রহণ করলো এবং বংশধরদের কাউকে আর বিদ্যালয়ে প্রেরণ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলো।
অতঃপর হামান পাঠশালা ও মক্তব রাজ্য থেকে উঠিয়ে ঢাক পিটিয়ে দেশময় প্রচার করে দিলো যে, কেউ আর লেখাপড়া শিখতে পারবে না। রাজার আদেশ অমান্য করলে সবংশে তার গর্দান যাবে।
প্রজারা ফেরাউনের আদেশ মতো চলতে লাগলো। লেখাপড়া আর কেউ শিখতে চেষ্টা করলো না। সারাদেশে কিছুকালের মধ্যে একেবারে গণ্ডমুর্খতে পূর্ণ হয়ে গেল। মূর্খের অশেষ দোষ। কোন ধর্মাধর্ম, হিতাহিত জ্ঞান তার থাকে না। তারা হয় কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। দুনিয়ার এমন কোন অসৎ কাজ নেই যা মূর্খে না করতে পারে! যখন তার রাজ্যের প্রজাদের এই অবস্থা ফেরাউন মনে মনে হাসতে লাগলো। তার উদ্দেশ্য এতদিনে সিদ্ধ হয়েছে। তিনি প্রত্যেককে একটা করে নিজের প্রতিমূর্তি দিয়ে তাকে সৃষ্টিকর্তা এবং উপাস্য বলে পূজা করতে হুকুম দিলেন।
নিজের ঘরে বসে যদি খোদার উপাসনা করা যায় তবে কেউ কি মসজিদে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াতে চায়? ফেরাউনের আদেশে সকলে সন্তুষ্ট হলো। এমন করে অনেক দিন কেটে যাওয়ার পর একদিন তিনি প্রজাদের ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তারা কাকে খোদা বলে মানে?
তারা বললোঃ ফেরাউনের প্রতিমূর্তিকেই খোদা বলে মান্য করে।
কিছুদিন যায়। একবার অনাবৃষ্টির জন্য দেশে দারুণ অজন্মা হয়েছিলো। এমন কি নীলনদের পানি পর্যন্ত শুকিয়ে গিয়েছিলো। প্রজারা সুযোগ মতো বাদশাহকে বললোঃ জাঁহাপনা আপনি যদি খোদা হন, তবে আপনি খেঅদার মতো ক্ষমতা আমাদের একবার দেখান।এবার বৃষ্টির অভাবে নীলনদ পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে এবং মাঠের সমস্ত ফসল পুড়ে গেছে। আপনি নীলনদ পানিতে পূর্ণ করে আমাদের ফসল রক্ষা করে দেবার ব্যবস্থা করে দিন।
এবার ফেরাউন বড় বিপদে পড়লেন! কিন্তু চতুরতার সঙ্গে তাদের আশ্বাস দিয়ে বললেনঃ এর আর এমন বেশি কথা কি! আগে এ সংবাদ আমায় জানাও নি কেন? আজ আমার অনেক কাজ-আজ সময় হবেনা। আগামীকাল তোমাদের নীলনগ পানিতে ভর্তি করে দেবো। তোমরা সেই পানি দিয়ে ফসল রক্ষা করো।
প্রজারা খুশী হয়ে বাড়ি চলে গেলো।
প্রজারা বিদায় হলে ফেরাউন চিন্তা করতে লাগলেন, কি করা যায়! সারাদিন কেটে গেলো –তারপর সন্ধ্যা হয়ে এলো। গভীর রাত্রে একাকী ঘোড়ায় চড়ে রাজধানী থেকে বেরিয়ে পড়লেন। শহর থেকে ময়দান পার হয়ে গ্রাম, গ্রাম পার হয়ে এক ভীষণ জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করলেন। সেখানে ছিল এক মস্ত বড় কূপ। সে কূপের ধারে এসে ফেরাউন ঘোড়া থেকে নামলেন। তারপর একগাছি দড়ি আপনার পায়ে বাঁধলেন, সে দড়ি একটা গাছের গোড়ায় শক্ত করে বেঁধে সেই কূপের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন। দোদুল্যমান অবস্থায় তিনি উচ্চঃস্বরে কেঁদে কেঁদে খোদার কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেনঃ হে দয়াময় প্রভু, তুমি অনেক পাপীর ইচ্ছা পূরণ করছো। এক্ষণে আমি বিপদগ্রস্ত। আমাকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে মালিক। এবারের মতো তুমি আমার মান বাঁচাও। তা’না হলে আমি রাত্রি প্রভাতে আর কারো কাছে মুখ দেখাতে পারবো না। পরকালে তুমি আমাকে যে শাস্তি হয় দিও।
এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, ওপর থেকে যেন বলছেনঃ ফেরাউন তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে। নীলনদ তোমার আদেশ মতো চলবে।
এই দৈববাণী শুনে ফেরাউন আনন্দে অধীর হয়ে কূপ থেকে উঠে রাজধানীর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। রাত্রি প্রভাত হতে না হতেই প্রজারা প্রসাদের সমুখে এসে সমবেত হতে লাগলো। ফেরাউন তাদের সঙ্গে নিয়ে নীলনদের কাছে এসে হাজির হলেনঃ চিৎকার করে বললেনঃ নীলনদ পানিতে পূর্ণ হয়ে থাকো।
কথা শেষ হতে না হতে শুষ্খ নদীর তটভূমি জোয়ারের পানিতে ভরে উঠলো। দিগন্ত বিস্তৃত শস্যক্ষেত্র পানিতে পরিপ্লুত হয়ে গেলো।
প্রজারা ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগ করলোঃ জাঁহাপনা জমি জমা ডুবে গিয়ে ফসল নষ্ট হয়ে যাবার মতো হলো। হুজুর আমাদের জমির পানি একটু কমিয়ে দেবার ব্যবস্থা করুন।
ফেরাউন তাদের প্রার্থনা মতো নীলনদকে আদেশ করলেন। পানি সরে গেলো প্রজারা খুশী হয়ে তাকে খোদা বলে বিশ্বাস করে নিলো। এরা কপতী শ্রেণীর লোক। কিন্তু বনি ইসরাইল নামে অপর এক শ্রেণীর লোক ছিল, তারা তাকে কোনক্রমেই খোদা বলে স্বীকার করলো না। কিন্তু ফেরাউন নানা অসম্ভব ও আশ্চর্য কাজ করে প্রজাদের মনে দিনে দিনে বিশ্বাস জন্মিয়ে দিতে লাগলেন যে, তিনিই প্রকৃত খোদা।
ফেরাউনের এক পোষ্যপুত্র ছিলেন, নাম মুসা। তিনি কখনো তাকেখেঅদা বলে স্বীকার করতেন না। মুসার জন্ম সম্বন্ধে একটা কাহিনী আছে। মিশরে ইসরাইলদের বংশ খুব বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছিলো। ইসরাইলগণ ফেরাউনকে অবিশ্বাস এবং উপহাস করতেন এজন্য ফেরাউন এদের মোটেই পছন্দ করতেন না। তিনি নিয়ম করলেন যে, ইসরাইলদের পুত্রসন্তান হলেই তাকে নীলনদের পানিতে ফেলে দিতে হবে। এমনিভাবে কত সন্তান যে বধ করা হলো তার সীমা সংখ্যা নেই।
একদিন ফেরাউনের স্ত্রী গোসল করতে এসে হঠাৎ দেখতে পেলেন নীলনদের ধারে নলবনের মধ্যে একটা সিন্ধুক ভেসে এসে আটকে রয়েছে। তিনি বুঝতে পারলেন, ছেলেটি ইসরাইলদের। শিশুটি দেখে তার অতিশয় মমতা হলো। তিনি তাকে পালন করবেন ঠিক করলেন। একজ ধাত্রীও পাওয়া গেলো। তার হাতে ছেলের ভার দেওয়া হলো। ছেলেটির নাম রাখা হলো মুসা।
সেই ধাত্রী অপর কেউ নন, তিনি মুসার গর্ভধারিনী। কালক্রমে ছেলেটি বড় হয়ে উঠলে তাকে ফেরাউনের স্ত্রীর নিকটে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। মুসা মিশরীদের সঙ্গে রইলেন বটে, কিন্তু সব সময় তাঁর মনে হতো তিনি যেন ইসরাইলী। একদিন মুসা দেখলেন, একজন মিশরীয় একজন ইসরাইলীকে বেদম প্রহার করছে। তিনি মিশরীয় লোকটিকে হত্যা করে বালিতে পুঁতে ফেললেন।
ফেরাউনের কাছে খবর গেলো। তিনি মুসাকে হত্যা করার হুকুম দিলেন। মুসা তখন পালিয়ে মিদিয়ান দেশে চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে এক কৃষকের কন্যাকে বিবাহ করলেন। তারপর মাঠে মেষ চড়িয়ে কাল কাটাতে লাগলেন।
অনেকদিন চলে যাবার পর একদিন মুসা তার জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতা হারুণকে সঙ্গে নিয়ে ফেরাউনের দরবারে এসে হাজির হলেন। বললেনঃ আপনি যে নিজেকে খোদা বলে প্রচার করছেন, এ অত্যন্ত অন্যায়। সর্বশক্তিমান খোদা ছাড়া আর কেউ মানবের উপাস্য নেই। আমি খোদার প্রেরিত পয়গম্বর।
ফেরাউন তাঁকে তাচ্ছিল্য করে হেসে উড়িয়ে দিলেন। বললেন, কেমন করে বুঝবো যে, খোদা তোমাকে পাঠিয়েছেন? তুমি তার কোন প্রমাণ দিতে পারো?
মুসা হাতের লাঠি মাটিতে ফেলে দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই লাঠি ভয়ানক অজগর সাপে পরিণত হয়ে গেলো। ফোঁস ফোঁস শব্দে সে যখন এগিয়ে যেতে লাগলো তখন তার মুখ হতে আগুনের হল্কা বের হতে লাগলো। সেই আগুনে গাছপালা মানুষ পশু-পাখি পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগলো। ফেরাউন ছুটে গিয়ে মুসার হাত ধরে মিনতি করে বললেনঃ মুসা, খোদা নাকি তোমাকে লোকের মঙ্গল করবার জন্য পাঠিয়েছেন আর তুমি তাদের ধ্বংস করবার চেষ্টা করছো একে নিবৃত্ত কর।
মুসা অজগরের গায়ে হাত দিতেই পুনরায় লাঠিতে পরিণত হলো। তিনি তখন ফেরাউনকে বললেনঃ আশা করি আপনি এখন অহঙ্কার ত্যাগ করে ধর্মপথে আসবেন।
ফেরাউন বিবেচনা করে পরের দিন জবাব দেবেন বলে সেদিন মুসাকে যেতে বললেন।
মুসা চলে গেলেন।
ফেরাউন রঙমহলে ফিরে এসে কেমন করে মুসাকে জব্দ করা যায় সে বিষয়ে উজীর-নাজীরদের সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলেন। উজীর হামান অতিশয় কুচক্রী এবং কুটবুদ্ধি সম্পন্ন ছিলেন। তিনি ফেরাউনকে বুঝিয়ে দিলেন, মুসা একজন প্রথম শ্রেণীর যাদুকর এবং অতিশয় ধাপ্পাবাজ ব্যক্তি। তাকে জব্দ করার একমাত্র কৌশল রাজ্যের যত বড়বড় যাদুকর আছে সকলকে তলব করে আনতে হবে। তাদের বিদ্যাবুদ্ধির কাছে হার মেনে মুসা এখান থেকে পালিয়ে গেলেই আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।
সুতরাং হামানের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ আরম্ভ হলো। রাজ্যের মধ্যে যেখানে যত ছোট-বড় যাদুকর ছিলো তাদের আনবার জন্য লোক পাঠানো হলো। তারা যথাসময়ে রাজধানীতে এসে হাজির হলো।
কার কত ক্ষমতা তা দেখবার দিন স্থির হলো। ফেরাউনের আহবানে মুসাও এলেন। একজন যাদুকর মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলো, অমনি চারিদিক থেকে হাজার হাজার সাপ, বিছা, ভীমরুল সৃষ্টি হয়ে নানা রকম শব্দ করতে করতে মুসার দিকে ছুটে যেতে লাগলো। অপর একজন মন্ত্র উচ্চারণ করতে আরম্ভ করলো, অমনি শত শত সিংহ, ব্যাঘ্র চারিদিক থেকে ভীষণ গর্জন করে মুসার দিকে এগিয়ে গেলো।
মুসা বিসমিল্লাহ বলে তার লাঠি মাটিতে রেখে দিতেই অমনি এক ভয়ানক অজগর ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠলো। চক্ষের পলকে সে যাদুকরদের সেই সিংহ, বাঘ, সাপ, বিছা, টপাটপ গিলে ফেললো। তারপর ধরলো যাদুকরদের। তাদেরও গলাধকরণ করে ফেরাউনের দিকে এগিয়ে গেলো। ফেরাউন সেখান থেকে ছুটে রঙমহলে পালিয়ে প্রাসাদের সদর দরজা বন্ধ করে দিলেন।
এই ঘটনার পর কিছুদিন কেটে গেলো। হঠাৎ একদিন মুসা ফেরাউনের দরবারে এসে পুনরায় তাকে ধর্মকথা শোনাতে লাগলেন এবং ধর্মপথে চলবার জন্য উপদেশ দিতে লাগলেন। কিন্তু ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী’।
আল্লাহতা’লা একদা স্বপ্নে মুসাকে বনি-ইসরাইলদিগকে পাপের ভূমি, অধর্মের রাজত্ব মিশর থেকে তাদের পিতৃভূমি কেনান দেশে ফিরে যাবার জন্য আদেশ দিলেন। সেই হুকুম অনুসারে মুসা ফেরাউনের কাছে ইসরা্লদের কেনান দেশে যাবার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু ফেরাউন কিছুতেই এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে তাদের মিশর ত্যাগ করতে দিলেন না, বরং তাদের প্রতি অত্যাচার করতে লাগলেন।
ইসরাইলদিগকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে উদ্ধার করাবর কোন উপায় না পেয়ে মুসা খোদার নিকটে প্রার্থনা করতে লাগলেন। খোদা তখন তাকে মিশরীয়দের উপর অত্যাচার করবার হুকুম দিলেন। মূসা ও তার ভ্রাতা হারুন মিশরীয়দের উপর নতুন নতুন উৎপাত আরম্ভ করলেন। মুসা নদীতে লাঠির আঘাত করলেন। দেখতে দেখতে পানি রক্ত হয়ে গেলো। নদীর সমস্ত মাছ মরে গেল, তারপর পচে দুর্গন্ধ বের হতে লাগরো। এতটুকু পানি পান করাবর কিছুমাত্র উপায় রইলো না। ইসরাইলদের মিশর ত্যাগের অনুমতি প্রদানের জন্য মুসা পুনরায় ফেরাউনকে অনুরোধ করলেন। ফেরাউন বললেনঃ নদীর পানি শুধরে দাও, আমি সে বিষয়ে বিবেচনা করবো।
মুসা তাঁর অনুরোধ রক্ষা করলেন। কিন্তু মুসাকে কয়েকদিন ঘুরিয়ে ফেরাউন তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন না। মুসা ক্রুব্ধ হয়ে পানির দিকে লাঠি ছুঁড়ে দিলেন। অমনি দলে দলে ব্যাঙ মিশর ভূমি ছেয়ে ফেললো। ফেরাউন মুসাকে ব্যাঙের হাত থেকে রক্সা করবার জন্য অনুরোধ জানালেন, মুসা এবারও রক্ষা করলেন।
ব্যাঙের কবল থেকে উদ্ধার পেয়ে ফেরাউন প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলেন। মুসাও পুনরায় তাদের প্রতি অত্যাচার আরম্ভ করলেন। উঁকুনের উৎপাত শুরু হলো; তারপর মাছির উৎপাত, পমুর মড়ক-একের পর এক আসতে লাগলো। এমন কি সকলের ভীষণ ফোঁড়া হলো। দেশে শিরাবৃষ্টি হয়ে গেলো। পঙ্গপাল এসে সব ফসল নষ্ট করে দিলো।
তারপর একবার তিনদিন-চারদিন এমন অন্ধকার হয়ে থাকলো যে, কোনদিকে কারো নজর করবার উপায় রইলো না।
মুসা আবার ফেরাউনকে অনুরোধ করলেন যে, এখনও ইসরাইলিদিগকে মিশর ছেড়ে যেতে অনুমতি দেওয়া হোক। যদি তাদের ছেড়ে যেতে দেওয়া না হয় তাহলে মিশরীয়দের ওপর যে ভীষণ অত্যাচার হবে তার তুলনায় বর্তমানের অত্যাচার অতি নগণ্য। ফেরাউনকে বার বার সতর্ক করে দেওয়া সত্ত্বেও তাঁর কথায় ফেরাউন একোরে কর্ণপাত করলেন না।
ইসরাইলদিগকে উদ্ধার করবার জন্য খোদা অসন্তুষ্ট হয় মিশরীয়দের প্রত্যেক বাড়ির বড় ছেলে ও বড় পশুকে মেরে ফেললেন। এবার ফেরাউনের বড় ভয় হলো। তিনি ইসরাইলদের চলে যাবার হুকুম দিলেন।
ইসরাইলরা অনুমতি পেয়ে দল বেঁধে রওনা হলেন, মুসা ও হারুন আগে চললেন। ইসরাইলদের চলে যেতে দেখে হামান প্রভৃতি উজীরগণ ফেরাউনকে কুপরামর্শ দিতে লাগলো, রাস্তাঘাট পরিস্কার, নালা-নর্দমা প্রভৃতি সাফ করা, রাজ্যের অনেক ছোটবড় কাজ যা তাদের দিয়ে জোর-জবরদস্তি করে করিয়ে নেওয়া হচ্ছিলো, তারা যদি চলে যায় তাহলে এসব কাজ কারা করবে? সুতরাং তারা যাতে মিশর ছেড়ে যেতে না পারে তার ব্যবস্থা করবার জন্য ফেরাউনকে অনুরোধ করতে লাগলো। ফেরাউন চিন্তা করে দেখলেন ইসরাইলরা চলে গেলে সত্যই কাজকর্মের যথেষ্ট অসুবিধা হবে। তখন তিনি নিজে ও মিশরীয়রা তাদের ফিরিয়ে আনবার জন্য সৈন্যসামন্ত নিয়ে তাদের পিছনে ধাওয়া করলেন।
ইসরাইলা ততক্ষণে লোহিত সাগরের তীরে এসে পৌঁছে গেছেন। এমন সময় তাঁরা পেছনে চেয়ে দেখতে পেলেন, ফেরাউনের অগণিত সৈন্য তাঁদের ধরতে আসছে। পেছনে এই বিপদ-সম্মুখে প্রকাণ্ড সাগর। ইসরাইলগণ কোথায় যাবেন ঠিক করতে পারছেন না, ভয়ে তাঁরা কাঁপতে লাগলেন। এমন সময় আল্লাহতা’লা মুসাকে বৈবাণীতে আদেশ করলেনঃ মুসা, তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রের ওপর আঘাত করো।
মুসা তাই করলেনঃ বিশাল সাগর দুই ভাগে দেয়ালের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সেই পথে দিয়ে হারুণ আগে চললেন, ইসরাইলরা নিরাপদে পিছু পিছু ওপারে চলে গেলেন। সমস্ত লোক পার হয়ে গেলো মুসা নিজেও।
তখনও সাগরের সেই রাস্তা তেমনি রয়ে গেলো। ফেরাউন তাঁহার লোকজন এবং সৈন্যসামন্ত নিয়ে ওপারে এসে থামলেন। তিনি দেখলেন, সাগরের মধ্যে এক আশ্চপর্য রাস্তা। আরও দেখলেন, সেই রাস্তা ধরে মুসা ও তাঁর লোকজনেরা নিরাপদে পার হয়ে গেলেন। যখন তারা সাগরের মাঝামাঝি এসেছে এমন সময় খোদা দৈববাণীতে মুসাকে বললেনঃ তাড়াতাড়ি সাগরের ওপরে তোমার লাঠি দিয়ে আবার আঘাত করো।
খোদার হুকুম মতো যেই তিনি সাগরের পানিতে আগাত করলেন, অমনি দুই দিন থেকে পান খাড়া উঁচু দেয়াল ফেরাউন ও তার সৈন্যদের ওপর পড়ে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। মরবার সময় তারা কাঁদবার অবসরটুকু পর্যন্ত পেলো না।
পোস্ট পড়ার সময় যথাস্থানে আঃ পড়ে নিবেন ।

" আদি মানব ও আজাযিল "

" আদি মানব ও আজাযিল "
পৃথিবী সৃষ্টির একেবারে প্রথশ দিকের কথা। তখন এখানে কোন জীবজন্তু, পশুপক্ষী বা কীটপতঙ্গ কিছুই ছিল না। সমস্ত দুনিয়ায় বাস করতো শুধু জিনেরা। তারা কেবলই নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি, মারামার নিয়েই থাকতো, ভুলেও কখনো আল্লাহ তা’লাকে স্মরণ করতো না। একদিন আজাযিল খোদার দরগায় আরজ (প্রার্থনা) করলোঃ হে প্রভু, আমাকে হুকুম দাও, আমি দুনিয়ায় গিয়ে জিনবংশ গারত (ধ্বংস) করে দুনিয়া থেকৈ পাপ দূর করে দেই। খোদা তার আরজ মঞ্জুর করলেন। আজাযিল চল্লিশ হাজার ফেরেশতাকে সঙ্গে নিয়ে নেমে এলো দুনিয়াতে। জিনদের সৎপথে আনবার জন্য অনক সদুপদেশ দিলো, কিন্তু তারা সে কথাতে একেবারে কর্ণপাতই করলো না। আজাযিল কি আর করে। তখন তাদের ধ্বংস করে বেহেশতে ফিরে গেলো। জিনের দল নিশ্চিহ্ন হওয়ায় দুনিয়া খালি পড়ে রইলো।
দোজখ (নরক) সব শুদ্ধ সাতটা। তার মধ্যে যে দোজখে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশী গোনাগারদের (পাপিদের) রাখা হয়, তার নাম সিজ্জীন। দুনিয়ার নিচের পাতাল এবং পাতালেরও অনেক নিচে সেই সিজ্জীন দোজখ। সেখানে দিনরাত শুধু দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। এত আগুন হবু সেখানে ভয়ঙ্কর অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে আজাযিলের জন্ম হয়। এই আজাযিল ভাল মানুষের দুশমন। দুনিয়ার মধ্যে তার মতো পাপি এখন আর কেউ নাই। সে শুধু নিজে পাপ করে না, প্রলোভন দ্বারা সকলকে পাপের পথে নিয়ে যায়। কিন্তু চিরকাল সে এমন ছিল না। তার মতো ধার্মিক এবং সৎ ফেরেশতারা অবধি হতে পারে নি। সত্যি সত্যি একদিন সে সকল ফেরেশতাদের সরদার ছিলো। খোদার নিকট তার মরতবা (মর্যাদা) অন্য সব ফেরেশতাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিলো।
আজাযিল জন্মের পরে কিন্তু অন্য জানোয়ারদের মতো বৃথা সময় নষ্ট করেনি। সে খোদার এবাদতে মশগুল হয়ে পুরা একটি হাজার বছর কাটিয়ে দিয়েছিল। সমস্ত দোজখে তিল পরিমাণ জায়গাও ছিলো না যেখানে দাঁড়িয়ে খোদার উপাসনা করেনি।
খোদা খুশী হয়ে তাকে সিজ্জীন দোজখ থেকে পাতালে আসবার অনুমতি দিলেন। কিন্তু এখানে এসেও তার অহঙ্কারের লেশমাত্র দেখা দিলো না। বরষ্ন খোদাতা’লার এবাদতে আরো অধিক মনোযোগ প্রদান করলো। দেখতে দেখতে হাজারবছর কেটে গেলো এবং এমন এতটুকু জায়গা ফাঁক রইলো না, যেখানে দাঁড়িয়ে সে খোদার উপাসনা করলো না। এমনি করে আরো হাজার বছর কেটে গেলো। খোদা তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দুনিয়ার উপরে নিয়ে এলেন। কিন্তু এত উন্নতি করেও সে খোদাকে ক্ষণকালের জন্যও ভুললো না। দিনরাত খোদার এবাদতে মশগুল হয়ে রইলো। করুনাময় খোদাতা’লা এবার তাকে প্রথম আসমানে তুলে নিলেন।
এমনিভাবে খোদাকে স্তবস্তূতিতে খুশী করে এক ধাপ এক ধাপ করে সে একেবারে আসমানে উঠতে লাগলো। এক এক আসমানে হাজার বছর করে সাত হাজার বছর ধরে আহার নেই, নিদ্রা নেই, দিনরাত কেবল রোজা আর নামাজ, নামাজ আর রোজা করে সে কাটালো। কোনো দিকে তার লক্ষ্য নেই, একম মনে এক প্রাণে খোদার উপাসনায় মশগুল হয়ে রইলো। খোদা তার ওপরে খুব খুশী হয়ে দোজখের না-পাক (অপবিত্র) জানোয়ারকে বেহেশতে আসবার অনুমতি দিলেন।
তাহলে তোমরা দেখছো, না-পাক জানোয়ারও নিজের সাধনার বলে মত উন্নতি করতে পারলো। কোথায় ছিলো আর কোথায় এলো। বেহেশতে এসে তার মনে এতটুকু দেমাগ বা এতটুকু অহঙ্কার দেখা দিল না। ফেরেশতাগণ যখন হাসিখুশী ও আমোদ-প্রমোদে রত থাকতো, তখন আজাযিল খোদার এবাদতে মগ্ন হয়ে থাকতো। মনে তার সুখ নেই –শান্তি নেই, চোখ দিয়ে কেবল ঝর-ঝর ধারায় পানি পড়তো। সে খোদার কাছে এই আরজ করতোঃ হে এলাহী আলমিন, তোমার এবাদত বন্দেগী কিছুই করতে পারলাম না। আমার গোনাহ মাফ করো। আমি বেহেশত চাই না –আমি চাই তোমাকে।
এইরূপ বেহেশতের আমোদ-আহলাদ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সমস্ত অগ্রাহ্য করে সে আরো হাজার বছর খোদার এবাদতে কাটিয়ে দিলো। এবার খোদাতা’লা তার ওপর অতিশয় সদয় হয়ে ফেরেশতাদের সরদার করে বেহেশতের খাজাঞ্চী করে দিলেন।
হলে কি হবে, তথাপি সে আল্লাহকে এক মুহুর্তের জন্যও ভুললো না। দিনরাত আল্লাহর নামে মশগুল হয়ে রইল, আর মাঝে মাঝে বেহেশতের মিনারের ওপরে উঠে আল্লাহতা’লার উপাসনার উপকারিতা সম্বন্ধে ফেরেশতাদের উপদেশ দিতে লাগলো। ফেরেশতাগণ তার জ্ঞান ও বুদ্ধি দেখে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলোঃ আজাযিল খোদার অতিশয় পিয়ারা (প্রিয়)। যদি আমরা খোদার কাছে কখনো কোন প্রকার বেয়াদবি করে ফেলি, তাহলে তার সুপারিশে আমরা বেঁচে যাবো। খোদা তার কতা না শুনে পারবেন না। এমনই করে ফেরেশতাদের মধ্যে মরতবা দিনে দিনে বেড়ে যেতে লাগলো। কিন্তু যার এত মরতবা তার আশা এখনো মিটলো না। এখনো খোদার এবাদত ছাড়া আর কোন দিক লক্ষ্য নেই। নিরালায় বসে কেবল খোদার যিকির করতে লাগলো। এইরূপে আরো হাজার বছর কেটে গেলো। সজল নয়নে কেবলই সে খোদার কাছে আরজ করতে লাগলোঃ হে রহমান, তুমি আমাকে দোজখ থেকে বেহেশতে এনেছো। এখন আমাকে মেহেরবানি করে একবার ‘লওহে মহফুযে’ তুলে নাও।
খোদা তার আরজ মঞ্জুর করলেন। সেখানে দিয়েও খোদার নাম ছাড়া অন্য কিছুই মনের মধ্যে সে স্থান দিলো না –দিনরাত খোদার উপাসনায় একেবারে ডুবে রইলো। একদিন সে দেখতে পেলো ‘লওহে-মহফুযের’ এক জায়গায় লেখা রয়েছে, “একজন ফেরেশতা ছয় লক্ষ বৎসর খোদার উপাসনা করিবার পরও যদি সে একটিবার খোদার আদেশ অমান্য করে, তা হলে সে চরম দুর্দশাপ্রাপ্ত হবে। তখন থেকে তার নাম হবে ইবলিশ”। আজাযিল ভয়ে কাঁপতে লাগলো! তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। কোন দিক তার হুঁশ নেই –ধীর স্থিরভাবে পাথরের মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খোদার দরগায় আরজ করতে লাগলো।
এমনিভাবে পাঁচ লক্ষ বছর কেটে গেলো। একদিন খোদা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন আজাযিল, এখানে কেউ যদি আমার একটি মাত্র আদেশ অমান্য করে, তবে তাকে কি শাস্তি দেওয়া উচিত?
আজাযিল প্রত্যুত্তর করলোঃ কেউ যদি আপনার আদেশ অমান্য করে, তাহলে তাকে আপনার দরবার থেকে চিরদিনের জন্য দূর করে দেওয়া উচিত।
খোদা বললেনঃ বেশ কথা। তুমি এখানে ঐ কথাগুলি লিখে রাখ।
আজাযিল খোদার হুকুম পালন করলো!
তোমাদের হয়তো স্মরণ আছে, আল্লাহর নির্দেশে আজাযিল জিনবংশ গারত করবার পরে দুনিয়া খালি পড়ে থাকে। খোদার বোধ হয় খেয়াল হলো যে, তিনি জিনদের বদলে মানুষ দ্বারা দুনিয়া পূর্ণ করবেন। তিনি সে কথা ফেরেশতাদের বললেন। তারা জবাব দিলোঃ হে পরোয়ারদিগার, একবার তুমি জিন পয়দা করে ঠকেছো। তারা কেবল ঝগড়াঝাটি মারামারি করে দিন কাটিয়েছে। আবার এখন মানুষ সৃষ্টি করে ফ্যাসাদ বাড়িয়ে কি লাভ! আমরা তো তোমার এবাদতে মশগুল আছি।
খোদা হেসে বললেনঃ দেখ ফেরেশতাগণ, আমি কি তোমাদের চেয়ে বেশি বুঝিনা।
এই কথা শুনে তারা খুব লজ্জা পেলো। তার বিনয়ের সঙ্গে বললোঃ হে রহমানুর রহিম। তোমার খেয়াল বুঝবার ক্ষমতা কারো নেই।
খোদতা’লা হযরত আদমকে সৃষ্টি করবার ব্যবস্থা করলেন। তিনি দুনিয়া থেকে একমুষ্টি মাটি নিয়ে হযরত আদমের শরীর সৃষ্টি করবার হুকুম দিলেন এবং দেহের মধ্যে আত্মা প্রবেশ করবার পূর্বে মাটিটুকুকে বেহেশতের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দেবার ব্যবস্থা করলেন?
একদিন আজাযিল ফেরেশতাদের সঙ্গে বেড়াতে বেড়াতে সেখানে এসে হাজিল। আদমের চেহারা দেখে সে খুব হাসতে লাগলো। তারপর তাঁকে নিয়ে এমন বিদ্রূপ শুরু করলো যে, ফেরেশতারা তাকে বললোঃ দেখ আজাযিল! খোদা যাকে খলিফারূপে দুনিয়ায় পাঠাবার জন্য পয়দা করেছেন, তাঁকে নিয়ে তোমার এরূপ বেয়াদবি করা উচিত নয়।
ফেরেশতাদের কথায় আজাযিল কিছুমাত্র লজ্জাবোধ করলো না, বরং অবজ্ঞাভরে বললোঃ বলো কি, খোদা এই মাটির ঢেলাকে খলিফারূপে দুনিয়ায় পাঠাবেন! তিনি যদি একে আমার অধীন করে দেন, তাহলে আমি এক্ষুণি একে গলা টিপে মেরে ফেলবো; আর আমাকে যদি এর অধীন করে দেন তবে আমি কিছুতেই মানবো না।
আজাযিলের স্পর্ধা দেখে ফেরেশতারা অসন্তুষ্ট হয়ে সেখান থেকে চলে গেলো। আজাযিল সেই মাটির মূর্তিটির সুমুখে খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কি চিন্তা করলো, তারপর তার নাক দিয়ে তার শরীরের মধ্যে ঢুকতে চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে বড় মুস্কিলে পড়লো। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বের হয়ে এসে সেই মূর্তির গায়ে থুথু দিয়ে সেখানে থেকে চলে গেল।
খোদার আদেশে এক শুভ মুহুর্তে হযরত আদমের আত্মা তাঁর শরীরে প্রবেশ করলো। তারপর তাকে বিচিত্র পোশাকে সজ্জিত করে একটি অনিন্দ-সুন্দর সিংহাসনে বসানো হলো। এইরূপে নিজের খলিফাকে সৃষ্টি করে খোদাতা’লা ফেরেশতাদের বললেনঃ আমি হযরত আদমকে তোমাদের চেয়ে বড় করে পয়দা করেছি। তোমরা এসে সেজদা (প্রণাম) করো।
খোদার আদেশ পেয়ে ফেরেশতারা অতিশয় ভক্তিতে ও শ্রদ্ধায় আদম আলাইহিসসালামকে সেজদা করলো। কিন্তু আজাযিল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো। সেজদা তো করলোই না –এমন কি মাথা পর্যন্ত নোয়াল না।
ফেরেশতারা আজাযিলের এই স্পর্ধা দেখে তাজ্জব হয়ে গেলো।
খোদা আজাযিলকে বললেনঃ আজাযিল! আমার হুকুমে ফেরেশতাগণ আদমকে সেজদা করলো, কিন্তু তুমি তাকে সেজদা করলে না কেন?
আজাযিল জবাবা দিলোঃ হে খোদা! আদমকে দুনিয়ার না-পাক মাটি থেকে পয়দা করছো, কিন্তু তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করছো। আমি তাকে সেজদা করিতে পারি না।
অতিশয় অসন্তুষ্ট হয়ে খোদা বললেনঃ রে মুর্খ, আত্ম-অহঙ্কারে তুই আমার হুকুম অমান্য করেছিস! জানিস তাকে মাটি থেকে পয়দা করবার ব্যবস্থা আমিই করেছি –আমিই তাকে ফেরেশতাদের বড় করেছি, আর আমিই তাকে সেজদা করতে বলেছি। কিন্তু এত স্পর্ধা তোর কিসে হলো? তুই এতদিন আমার এবাদত করেছিস সেই জন্য কি? কিন্তু তুই-ই না লওহে-মহফুযে’ লিখে রেখেছিস লক্ষ লক্ষ বৎসর আমার এবাদতে মশগুল হয়ে থাকলেও আমার একটি মাত্র আদেশ অমান্য করলে সমস্ত এবাদত পণ্ড হয়ে যাবে? তুই আজ থেকে মরদুদ হয়ে গেলি। তুই আমার দরবার থেকে দূর হয়ে যা।
খোদা এই কথা বলবার সঙ্গে সঙ্গে আজাযিলের চেহারা বিশ্রীরূপে পরিবর্তিত হয়ে গেলো। তার পায়ের রং হলো অত্যন্ত কালো, মুখ হলো শুকরের মুখের মতো। চোখ দু’টি কপাল থেকে বুকের ওপর নেমে এলো। তার নাম হলো ইবলিস।
আজাযিল নিজের দুর্দশা দেখে মনে মনে খুব ভয় পেলো, কিন্তু বাইরে সে ভাব মোটেই প্রকাশ করলো না। খোদার দরগায় আরজ করলোঃ হে খোদা! আমি নিজের অহম্মকিতে যে পাপ করেছি তার শাস্তি ভোগ আমাকে করতেই হবে‍! তার জন্য আমাকে যে দোজখী করেছ, তাও আমাকে মানতে হবে। আমি জানি, হাজার চেষ্টা করলেও আমার এ কসুর মাফ হবে না। তোমার দরবার থেকে চিরকালের জন্য চলে যাবার আগে আমি গোটা কয়েক আরজ পেশ করতে ইচ্ছা করি। আশা করি তুমি তা মঞ্জুর করবে।
খোদা বললেনঃ বল তোর কি আরজ আছে?
ইবলিস বললোঃ আমার প্রথম আরজ এই যে, আমাকে কেয়ামত (শেষদিন) পর্যন্ত স্বাধীনতা দাও।
খোদা সে আরজ মঞ্জুর করলেন।
ইবলিস তার দ্বিতীয় আবেদন পেশ করলো। বললোঃ আমাকে লোকচক্ষে অদৃশ্য করে দাও। আর কেউ জানতে না পারে এমনি করে সকলের হাড় মাংস স্নায়ু মজ্জা শরীরের মধ্যে প্রবেশ করবার ক্ষমতা দাও।
খোদা তাও মঞ্জুর করলেন।
তারপর ইবলিস বললোঃ লক্ষ লক্ষ বছর তোমার এবাদতে মশগুল থেকে সিজ্জীন দোজখ হতে বেহেশতে আসবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। কিন্তু তোমার তৈয়ারী সামান্য বান্দার ওপর বেয়াদবি করার জন্য আমাকে শাস্তি দিলে। তোমার প্রিয় মানবের ওপর আমি তার প্রতিশোধ নেবো। তুমি আমাকে শয়তান করলে। আমি তোমার বান্দাকে শয়তান করে তৈরী করবো! যেমন সামান্য একটু কসুরে আমাকে নারকী করলে, তেমনি তোমার প্রিয় মানুষেরা দিন রাত তোমার রোজা নামাজ করলেও আমি বান্দাকে দোজখে পাঠাবার ব্যবস্থা আমি করবো, আর তুমি তাদের সৎপথে চালিত করবার জন্য অনেক নবী ও পয়গম্বর পাঠাবে। তারা তাদের উদ্ধারের জন্য অনেক পরামর্শ, অনেক উপদেশ দান করবেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হবে না। আজ থেকে তোমার মানবের অনিষ্ট করাই হবে আমার একমাত্র কাজ।
এই বলে ইবলিস ডানা মেলে দুনিয়ার দিকে উড়ে গেলো। সেই থেকে সে শয়তান। তার প্রতিজ্ঞা কেমন করে পূরণ করছে তা তোমরা দিন রাত দেখতে পাচ্ছ। খোদার ঈমানদারের চেয়ে শতাদের বেঈমানদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
তাহলে তোমরা দেখতে পেলে, ইবলিস লক্ষ লক্ষ বছর খোদার উপাসনা করে কত উন্নতি করেছিলো। একদিনের সামান্য একটু কসুরে তা সমস্ত নষ্ট হয়ে তার কত অধঃপতন হলো। সুতরাং তোমার জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ন্যায় ধর্ম ও সত্য পথে চলতে চেষ্টা করবে। কখনো ভুলেও এক নিমিষের জন্য একটুও ত্রুটি করবে না। জীবরেন একটু কসুরও খোদা মাফ করেন না। তোমরা হয়ত মনে করবে, প্রথমে একটু আধটু কসুর করে ভাল ভাল কাজ করবে, কিন্তু তা হয় না।

" স্বর্গ চ্যুতি "

" স্বর্গ চ্যুতি "
মাটির দ্বারা প্রস্তুত তুচ্ছ মানব আদমের জন্য আজাযিলের এই দুর্দশা ঘটলো। আজাযিল সেই নিরপরাধ আদমকে জব্দ করবার জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগলো।
খোদাতা’লা বেহেশতে বিচিত্র উদ্যান রচনা করে নানারকম সুন্দর সুন্দর ফল ও ফুলের গাছ সৃষ্টি করলেন। সেই বাগানের দু’টি গাছ সৃষ্ট হলো –তার একটি নাম জীবন-বৃক্ষ, অপরটির নাম জ্ঞান-বৃক্ষ। খোদা আদমকে সেই বাগানে বাস করবার অনুমতি দিলেন। খোদা আদমকে অনুমতি দিলেন –বাগানের সমস্ত গাছের ফল সে খেতে পারে, কিন্তু জীবন-বৃক্ষ ও জ্ঞান-বৃক্ষের ফল সে কখনো যেন ভক্ষণ না করে। এই গাছের ফল আহার করামাত্র তার মৃত্যু ঘটবে।
এর পরে অনেক দিন চলে যাবার পর খোদা মনে করলেন আদমেরন একজন সঙ্গিনী সৃষ্টি করা প্রয়োজন। একদিন তিনি সমস্ত পশুপক্ষীকে আদমনের নিকটে এনে তাদের প্রত্যেকের নামকরণ করতে বললেন। আদম প্রত্যেক জীবের আলাদা আলাদা নাম রাখলেন। তারা চলে গেলে আদম চিন্তা করতে লাগলেন, খোদাতা’লা সকল জীবজন্তুকে জোড়া করে সৃষ্টি করেছেন কেবল মাত্র তিনিই একাকী রয়েছেন।
সেই রাত্রে আদ ঘুমিয়ে পড়লে খোদা তাঁর বাম পাঁজড় থেকে একটা হাড় বের করে নিয়ে তা দিয়ে একটি নারী সৃষ্টি করে তাঁর পাশে শুইয়ে রাখলেন। ঘুম ভাঙলে পাশে একটি সুন্দরী নারীকে দেখে তিনি মনে মনে পরম বিস্ময়বোধ করলেন। এমন সময়ে খোদা বললেনঃ এর নাম বিবি হাওয়া। এ হলো তোমার সঙ্গিনী। তোমরা দু’জনে একত্রে বেহেশতের বাগানে থাকবে, খেলবে, বেড়াবে। কিন্তু সাবধান সেদিন তোমাকে নিষেধ করেছি –আজ আবার তোমাকে ও তোমার সঙ্গিনীকে বলছি, যখন ইচ্ছে হবে এই বাগানের সকল রকম ফল আহার করবে, কিন্তু এই জীবন-বৃক্ষ ও জ্ঞান-বৃক্ষের ফল কখনো আহার করবে না!
সেই দিন থেকে আদম ও হাওয়া মনের সুখে সেই বাগানের নানা রকম ফলমূল খেয়ে বেড়াতে লাগলেন।
একদিন হাওয়া একা একা বাগানে বেড়াচ্ছেন। এই সুযোগে শয়তান একটা সাপের মূর্তি ধরে তাঁর কাছে এলো। সে সময়ে সিংহ, বাঘ, সাপ, গরু, হরিণ, ভেড়া, ছাগল সকলে একসঙ্গে খেলা করতো। কেউ কাউকে হিংসা করতো না। সাপ হাওয়াকে জিজ্ঞাসা করলোঃ তোমরা কি এই বাগানের সব গাছের ফল খাও।
হাওয়া জবাব দিলেনঃ না, দু’টি গাছের ফল খাওয়া আমাদের নিষেধ!
সাপ জিজ্ঞাসা করলোঃ কোন কোন গাছের ফল তোমরা খাও না?
হাওয়া গাছ দু’টি দেখিয়ে দিলেন।
সাপ বললোঃ কেন তোমরা এ দু’টি গাছের ফল খাও না?
হাওয়া বললেনঃ জানি না খোদা বারণ করেছেন।
সাপ বললোঃ খোদা তোমাদের বোকা বানিয়ে এখানে রেখেছেন। এই গাছের ফল খেলে তোমাদের জ্ঞান-চক্ষু খুলে যাবে, তোমাদের ওপরে খোদার আর কোন কারসাজি চলবে না, তাই খোদা তোমাদের এই গাছের ফল খেতে বারণ করেছে, কি সুন্দর আর মিষ্টি এই ফল তা তোমরা জানো না।
সাপের কুপরামর্শে হাওয়ার মন দুলে উঠলো। তিনি ভাবলেন –তাইতো, অমন সুন্দর ফল না জানি কেমন মিষ্টি! তিনি লোভ সামলাতে পারলেন না। একটা ফল ছিঁড়ে নিলেন। আধখানা নিজে খেয়ে অর্ধেক আদমের জন্য নিয়ে গেলেন। আদম হাওয়ার হাত থেকে সেই নতুন রকমের ফলটুকু নিয়ে সাগ্রহে খেলে ফেললেন।
শয়তান উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে মনে মনে হাসতে লাগলো। ফল খাবার পরে তাঁরা সর্বপ্রথম মুঝতে পারলেন যে নিজেরা বস্ত্রহীন। তখন বড় বড় ডুমুরের পাতার সঙ্গে লতা গেঁথে তাঁরা লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করতে লাগলেন। এমন সময়ে খোদাতা’লা আদম ও হাওয়াকে নিকটে ডাকলেন, কিন্তু তাঁরা প্রতিদিনের মতো সমুখে গেলেন না। গাছের আড়ালে গিয়ে লুকোলেন।
খোদাতা’লা বললেনঃ আমি বুঝতে পেরেছি তোমরা জ্ঞান-বৃক্ষের ফল খেয়েছো।
আদম বললেনঃ হাওয়া আমাকে দিয়েছে।
খোদা ক্রুব্ধ কণ্ঠে বললেনঃ আমার আদেশ অমান্য করে যে পাপ আজ তোমরা করলে, বংশ পরম্পরাক্রমে এর ফল সকলকে ভোগ করতে হবে। ত
হাওয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি অভিশাপ দিলেনঃ তুমি প্রসব বেদনায় অত্যন্ত যন্ত্রণা ভোগ করবার পর তোমার সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। চিরকাল তোমাকে পুরুষের অধীন হয়ে থাকতে হবে। পুরুষ তোমায় শাসন করবে।
আদমকে তিনি অভিশাপ দিলেনঃ তোমার শস্যক্ষেত্র আগাছা কুগাছা ও নানা কাঁটা গাছে ভর্তি হয়ে যাবে। এক মুষ্টি অন্নের জন্য আ-মরণ তোমাকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে।
সাপকে অভিশাপ দিয়ে বললেনঃ নির্বোধ নারীকে কুপরামর্শ দিয়ে পাপ করিয়েছ –এর শাস্তি তোমাকে সারা জীবন ভোগ করতে হবে। যে মাটিতে মানুষ পা দিয়ে চলবে সেই মাটিতে সর্বদা বুক পেতে তুমি চলবে এবং সেই খেয়ে তোমাকে জীবনধারণ করতে হবে। এই নারী বংশই হবে তোমাদের পরম শত্রু! তারা যখনই তোমাকে দেখবে তখনই বধ করার চেষ্টা করবে।
এই কথা বলে খোদা দু’খানা চামড়া তাঁদের পরিয়ে বাগান থেকে বের করে পৃথিবীতে নির্বাসন দিলেন।

" হাবিল ও কাবিল "

" হাবিল ও কাবিল "
হযরত আদ ও বিবি হাওয়া শয়তাদের কুচক্রে পড়ে বেহেশতচ্যুত হলেন। তাঁরা আল্লাহতা’লার অভিশাপে পৃথিবীতে এসে বাস করতে লাগলেন। ক্রমে তাঁদের সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহণ করতে লাগলো। হযরত আদমের বংশধরগণের মধ্যে হাবিল ছিলেন অতিশয় ধর্মপ্রাণ। তিনি রাতদিন কেবল খোদার বন্দেগীতে মশগুল হয়ে থাকতেন। অন্য কোন দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিলো না।
ইবলিস আদমের ওপরে হাড়ে হাড়ে চটে ছিলো। সে কেবল সুযোগ খুঁজছিলো কি করে এঁর সন্তানগণকে পথভ্রষ্ট করা যায়। অবশেষে অনেক প্রলোভন দিয়ে কাবিল নামক পুত্রকে আপনার অধীনে আনতে সমর্থ হলো। কাবিল শয়তানের ফেরেরীতে পড়ে মুহুর্তের জন্য ভুলেও একবার আল্লাহতা’লার নাম মুখে আনতো না, বরং দিনে দিনে পাপের পথে অধিক অগ্রসর হতে লাগলো।
একদিন হাবিল ও কাবিল মনস্থ করলো যে, তারা উভয়ে আল্লাহতা’লার উদ্দেশ্যে একটা পশুকে কোরবানি দেবে। নির্দিষ্ট দিনে উভয়ে দু’টি পশু জবেহ করলো। ধার্মিক ও পরহেজগার হাবিলের কোরবানি মঞ্জুর হলো, কিন্তু পাপী কাবিলের কোরবানী খোদা মঞ্জুর করলেন না।
কাবিল যখন বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ তার কোরবানি গ্রহণ করেননি, তখন সে মনে খুব আঘাত পেলো। সে ভাবলো যে, হাবিলের কারসাজিতেই খোদাতা’লা তার প্রতি বিমুখ হয়েছেন। সে প্রতিহিংসায় উত্তেজিত হয়ে চীৎকার করে বলে উঠলোঃ তেমাকে খুন করবো হাবিল। তোর জন্যই আমার কোরবানি মঞ্জুর হলো না।
কাবিলের কথা শুনে হাবিল তো অবাক! সে কাবিলকে বললোঃ সে কি কাবিল –আমি তোমার কাছে কি অপরাধ করেছি যে, তুমি আমাকে খুন করবে? তুমি যদি আমাকে খুন করো তবে আমার ও তোমার উভয়ের পাপ তোমাকে আজীবন বহন করতে হবে। তার পরে খোদাতা’লা তেমাকে এর শাস্তির জন্য দোজখে পাঠাবেন। তোমার দুর্দশার সীমা থাকবে না। তুমি এমন পাপ কখনো করো না ভাই।
হাবিলের কতায় কাবিল আলো বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠলো। সে লাফ দিয়ে হাবিলের বুকের ওপরে ওঠে গলা টিপে ধরলো। ধর্মপ্রাণ হাবিল দম বন্ধ হয়ে মারা গেলো।
হাবিলকে মেরে ফেলে কাবিল ভয়ানগ বিপদে পড়ে গেলো। হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে সে চিন্তা করতে লাগলো। কি করবে, কিছুই স্থির করতে পারলো না। সে পাগলের মতো এদিক-ওদিন ছুটোছুটি করতে লাগলো। হাবিলের লাশটার কি গতি হবে তা সে ভেবে পেলো না।
এই ঘটনার পূর্বে কোন মানুষ মরে নি, খুন খারাবিও কোনো দিন হয়নি। কাজেই মৃতদেহ কিরূপে দাফন-কাফন করতে হয় তা কারুরই জানা ছিলো না।
হাবিলকে খুন করে মাথায় হাত দিয়ে কাবিল আকাশ পাতাল চিন্তা করতে লাগলো। এখন সে কি করে, কোথায় যায়, কার পরামর্শ লয়।
আল্লাহতা’লা কাবিলের বিপদ বুঝতে পেরে একটি কাককে সেই স্থানে পাঠিয়ে দিলেন। কাকটি ঠোট দিয়ে ঠুকরে মাটি খুঁড়তে লাগলো। কাকের এই ব্যাপার দেখে কাবিল যেন অকূলে কুল পেলো। এরূপবাবে মাটি খুঁড়ে হাবিলকে তো অনায়াসে মাটিতে পুতে রাখা যায়। কথাটা মনে হতেই কাবিল একখানা অস্ত্র সংগ্রহ করে এনে মাটি খুঁড়ে হাবিলকে কবর দিলো। তারপর অনুতপ্ত হয়ে ভ্রাতার শোকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।

" আদ জাতির ধ্বংস

" আদ জাতির ধ্বংস "
মহাপ্লাবনের পর বহু বছর কেটে গেছে।
আরবে আদ নামক একটা জাতি অতিশয় শক্তিশালী হয় উঠেছিলো। তারা খোদাকে মানতো না –ইচ্ছা মতো যা খুশী করতো। কখনো পাথর, কখনো পুতুল, কখনো গাছপালাকে পূজা করতো। খোদাতা’লা তাদের হেদায়েত করার জন্য হুদ (আঃ) কে সৃষ্টি করলেন। হুদ তাদের এই কুকার্য দেখে মনে মনে অতিশয় দুঃখিত হলেন। তিনি আপনার জ্ঞাতিবর্গকে ডেকে বললেনঃ তোমাদের কুপথ থেকে সৎপথে আনবার জন্য খোদা আমাকে পাঠিয়েছেন। যদি তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান না আন তবে তিনি কঠিন গজব তোমাদের উপরে নাজেল করবেন। তোমরা আল্লাহতা’লার এবাদত করো। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপাস্য নাই। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং নিরাকার। তিনি দয়ালু ও মহান।
কাফেররা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলোঃ তুমি কি ভেবেছো যে তোমার কথা মতো আমাদের ধর্ম ছেড়ে তোমার নিরাকার আল্লাহর এবাদত করবো? ও ব চালাকী আমাদের কাছে চলবে না। যদি বেশি বাড়াবাড়ি করো তবে মেরে তোমার হাড়গুড়োঁ করে দেবো। হযরত হুদ তাদের কতা গ্রাহ্য মাত্র করলেন না। তিনি এই কুপথগামী লোকদের ধর্ম পথে আনবার জন্য যথাসাধ্য উপদেশ দিতে লাগলেন। মাত্র অল্প কয়েকজন লোক তাঁর কথায় বিশ্বাস করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো। অধিকাংশ লোকই তাঁর উপদেশ শুনলো না, অবহেলা ভরে বললোঃ হুদ! তুমি তো আমাদের মতো মানুষ ছাড়া আর কিছুই নও। বড় বড় বক্তৃতা করে আমাদের মধ্যে সম্মান লাভ করতে চাও এই তো তোমার উদ্দেশ্য। যদি আল্লাহতা’লার শিক্ষা দেবার দরকার হয়, তাহলে তিনি অন্যবাবে আমাদের শিক্ষা দিবেন। এজন্য তুমি এত মাথা ঘামাও কেন? তুমি নিজির চরকায় তেল দাও গে, আমাদের জন্য ভেবো না।
হযরত হুদ যখন লোকদের সৎপথে আনতে পারলেন না, তখন তিনি নিরুপায় হয়ে আল্লাহতা’লার নিকট মনের দুঃখে আরজ করতে লাগলেনঃ হে রহমান রহিম আমার কথায় এরা কর্ণপাত মাত্র করলো না। এরা বড় পাপী। তুমি ছাড়া এদের শিক্ষা দিতে পারে এমন আর কেউ নেই। তুমি এদের কঠিন শাস্তি দিয়ে বুঝিয়ে দাও তোমার মহান অস্তিত্ব। তুমি সর্বশক্তিমান –তুমি এদের চেতনা জাগ্রত করো।
খোদাতা’লা তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। এরপর হুদ ধর্ম প্রচার বন্ধ রেখে নীরবে নিজের ঘর-সংসারের কাছে মনঃসংযোগ করলেন।
কাফেররা হুদকে এইরূপে চুপচাপ থাকতে দেখে খুব ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে লাগলো। সবাই বলতে লাগলো। হুদ এবার ঠিক বুঝেছে, আমাদের ঠকানো অত সোজা নয় –তাই চুপচাপ বসে গেছে ঘর সংসার নিয়ে। বেচারা এতো গলাবাজি করলো বটে কিন্তু সবই পণ্ড হলো।
একদিন আল্লাহ হযরত হুদকে জানিয়ে দিলেনঃ এবার পৃথিবীতে ভয়ানক ঝড় বৃষ্টি আরম্ভ হবে। তোমরা পরিজনবর্গ এবং সামাজ্য দু’চারজন অনুচর যা আছে তাদের সঙ্গে নিয়ে একটি নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করো।
খোদার আদেশ পেয়ে হুদ আত্মীয়-পরিজনদের নিয়ে একটি গহবরে গিয়ে লুকালেন। অতঃপর ভীষণ ঝড় ও শিলাবৃষ্টি আরম্ভ হলো। প্রবল ঝড় ও ঘুর্ণিবায়ুতে মাটির ওপরে ঘরবাড়ি গাছপালা কিছুই আর দাঁড়িয়ে রইলো না, সমস্ত ধ্বংস হয়ে গেলো।
তারপর ধীরে ধীরে প্রকৃতি শান্ত হলো। তখন দেখা গেলো আদ জাতির লোকদের ঘরবাড়ির চিহ্নমাত্র নেই এবং তারাও সবংশে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
খোদা পাপীদের এই রকমেই শাস্তি দিয়ে থাকেন।

" ছামুদ জাতির ধ্বংস "

" ছামুদ জাতির ধ্বংস "
ছামুদ জাতির আরবের অন্তর্গত হজর ও ওয়াদিলকোর অঞ্চলে বাস করতো। তারা পাথর কেটে সুন্দর গৃহ নির্মাণ করতে জানতো। জীবজন্তু মারবার জন্যে পাথর কেটে আশ্চর্য রকম অস্ত্রশস্ত্র তৈরী করতো। এদের মধ্যে কতক শ্রেণীর লোক পাহাড়ের গুহায় বাস করতো। এরা আল্লাহতা’লাকে মানতো। যা কিছু বড় এবং অদ্ভুত তাদের চক্ষে লাগতো তারই প্রতিমূর্তি পাথর দ্বারা তৈরী করে পূজা করতো। তাছাড়া দিনরাত ঝগড়া ও দাঙ্গাহাঙ্গামা নিয়ে থাকতো। আল্লাহতা’লা তাদের মধ্যে হযরত ছালেহকে নবীরূপে পাঠালেন। হযরত ছালেহ তাদের ডেকে বললেনঃ ভাইসব খোদা তোমাদের এই মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন, আবার এই মাটিতেই লয় করবেন। তাঁর কতা একবার ভেবে দেখ, তিনি ছাড়া তোমাদের কাছে আমি পরমার্থিক আলো নিয়ে এসেছি। মনে করে দেখ আদ জাতি হযরত হুদের কথা শোনেনি –এজন্য তারা কিরূপভাবে তোমাদের সামনেই ধ্বংস হয়ে গেলো। যার কৃপায় এই পাহাড়ের ওপরে এমন সুন্দর গৃহ নির্মাণ করে বাস করছো তার কথা একবার চিন্তা করো।
একদল লোক তাঁর কথায় বিশ্বাস স্থাপন করলো। কিন্তু যারা অর্থশালী, বলশালী এবং নিজেদের খুব গণ্যমান্য ব্যক্তি বলে মনে করতো, তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত মাত্র করলো না। বরঞ্চ তাঁরা হিতোপদেশে উত্যক্ত হয়ে তারা তাঁর প্রতি খড়গহস্ত হয়ে উঠলো এবং দিনরাত ষড়যন্ত্র করতে লাগলো, কি করে হযরত ছালেহ ও তাঁর অনুরগবর্গকে আক্রমণ করলো, কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে তাদের সকল অভিযান ব্যর্থ হয়ে গেলো। ছালেহ ও তার অনুচরবর্গ অক্ষত দেহে রক্ষা পেলো, কিন্তু আতায়িগণ সদলে ধ্বংস হলো।
ছামুদেরা বিধ্বস্ত হলে কাফেররা অক্ষত অধিকতর প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠলো। তারা ছালেহকে মারবার জন্যে বদ্ধপরিকর হয়ে সুযোগ খুঁজতে লাগলো। সামাজিকভাবে তাঁকে লোকচক্ষে হেয় করবার জন্য সর্বাদ উপহাস ও বিদ্রূপ করতে লাগলো। তাদের মধ্য হতে কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি ছালেহকে ডেকে বললেনঃ তুমি যে আল্লাহর নবীরূপে আমাদের কাছে এসেছো বলছো, কি করে আমরা বুঝতে পারবো যে, তুমি সত্যই আল্লাহর পয়গম্বর।
ছালেহ তখন আল্লাহ পাকের কাছে আরজ করতে লাগলেন। আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করলেন এবং নিকটবর্তী পাহাড় দ্বিখণ্ডিত করে তার মধ্যে থেকে একটা উট বের করে তার কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
ছালেহ সেই উটকে নিয়ে কাফেরদের কাছে গেলেন। বললেনঃ তোমরা আমার কাছে তাঁর চিহ্ন দেখতে চেয়েছো তাই খোদাতা’লা এই উটটিকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। তোমরা কেউ এর অনিষ্ট করো না, বরং একে ঘাস ও পানি দিও। এর প্রতি অত্যাচার করলে খোদার গজব (রোষ) তোমাদের ওপর পতিত হবে।
কাফেররা উটটিকে দেখে হো-হো করে হেসে উঠলো। তারা মনে করলো এটা একটা সামান্য জন্তু ছাড়া আর কিছুই নয়, ছালেহ শুধু তাদের ভয় দেখাবার জন্য এটিকে এনেছে। খোদার প্রেরিত কোন চিহ্নই এর গায়ে নেই। এ রকম উট তো তারা হামেশাই জবেহ করে ভক্ষণ করছে! একে যদি নিত্য খাদ্য ও পানি দেওয়া হয় তাহলে তাদের জন্তুগুলো আধপেটা খেয়ে মরার শামিল হয়ে পড়বে। তার চেয়ে এই উটটিকে রাত্রিকালে হত্যা করে সকলে ফলার করবে।
উটটিকে বধ করেও যখন তাদের কোন অনিষ্ট হলো না, তখন তারা আনন্দে নৃত্য করতে লাগলো। তাহারা হযরত ছালেহকে নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রূপ করতে লাগলো। অবশেষে এমন দুর্গতি তাঁর করলো যে, দেশে বাস করা তাঁর দায় হয়ে উঠলো। তিনি নিরুপায় হয়ে আল্লাহতা’লার কাছে দুই হাত তুলে প্রার্থনা করতে লাগলেনঃ হে করুণাময়, হে দ্বীন-দুনিয়ার মালিক। আমি কিছুতেই এদের ভ্রম ঘুচাতে পারলাম না। তুমি যদি এদের শাস্তি না দাও, তবে হয়তো শীঘ্রই এরা আমাদের বধ করবে। তুমি উপযুক্ত বিচার করো।
তাঁর প্রার্থনা আল্লাহ মঞ্জুর করলেন।
এই ঘটনার তিন দিন পরে রাত্রিশেষে ভীষণ ভূমিকম্প আরম্ভ হলো। অবিশ্বাসী ছামুদদের ঘরবাড়ি সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো এবং তারাও সেই ভগ্নাস্তূপের নিচে সমাধি লাভ করলো। পৃথিবীর বুঝে জীবিত রইলেন হযরত ছালেহ ও তাঁর অনুচরবর্গ।